দেশীয় রাজনীতির নেগেটিভ-পজেটিভ
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট। ছবিঃ সংগৃহীত।
রাজনীতি স্থান ও কাল ভেদে কখনো সহনশীল আবার কখনো নির্মম হয়। তবে এ দু'টি বিষয় দুই শ্রেণির রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছে ভিন্ন মাত্রা রূপে বিবেচিত হয়। যারা ছাত্রজীবন থেকে পাবলিক রিলেশনের মাধ্যমে রাজনীতিতে একটা অবস্থানে এসেছেন তারা সব সময় অতীতকে স্মরণ করে রাজনীতির ধারক, বাহক ও দূত রূপে নিজ সংগঠনের জন্য কাজ করেন। কেননা তাদের মাথায় সব সময় একটা বিষয় কাজ করে তা হলো রাজনীতি একটা পবিত্র সত্তা তাই সামান্য ভুলের জন্য গতি পথ 'সাপ লুডু' খেলার মতো সর্বোচ্চ স্থান থেকে সর্বনিম্নে পতন অস্বাভাবিক নয়। তাই তারা রাজনীতির প্রতিটি স্তরে খুব সাবধানে পা ফেলেন যাতে নিজ পরিবার তথা তাঁর পূর্বসূরী বা উত্তরসূরীরা রাজনীতির শিষ্টাচার বহির্ভূত কর্মের কারণে কলঙ্কিত না হয়। হালে এই শ্রেণির রাজনীতিবিদদের জীবন চক্র বা রাজনীতির গতিপথ খুবই মন্থর, বলতে পারেন অনিশ্চিত।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো কিছু মানুষের কাছে রাজনীতি পেশা নয়, লাভজনক ব্যবসা। তারা মনে করেন, রাজনীতি করতে শেখার, বুঝার বা জানার কিছু নেই, যা করবেন তাহাই রাজনীতি। তাদের কাছে রাজনীতি শুধু সিনিয়র নেতাদের খুশী রাখতে তৈল মর্দনের পাশাপাশি সিণ্ডিকেট তৈরী করে নেতাকে বিভ্রান্ত করে নিজের স্বার্থ হাসিল করতঃ নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে যাওয়ার একটা প্রক্রিয়ামাত্র। তারা মনে করেন কবি কামিনী রায়ের কবিতা "পাছে লোকে কিছু বলে" অনুসরণ করে রাজনৈতিক কৌশল মেনে চলা একেবারে অর্থহীন। আরো মনে করেন তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে কে কি বললো আর ভাবলো এ নিয়ে ভাবার মোটেও সময় নেই। রাজনীতির প্লাটফর্ম বা সমাজে তাদের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশকে তারা ধর্তব্য বিষয় মনে করেন না বা বিবেচনায় নেন না। তারা মনে করেন, সমাজ বা সামাজিক আচার-অনাচার বলতে কিছু নেই। কেবল মাত্র অর্থ উপার্জন ও ক্ষমতার বলয় তৈরী করতে যা যা দরকার তাহাই করার নাম রাজনীতি।
এই শ্রেণির মানুষ সমাজকে কলুষিত করতে খুন, রাহাজানী, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, অস্ত্র সংগ্রহ ও যত্রতত্র ব্যবহার, মাদক বানিজ্য, মাদকে আসক্ত, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো জঘণ্য অপরাধ গুলোকে রাজনীতির অংশ বলেই বিবেচনা করেন। তাদের যেমন পূর্বসূরী বা উত্তরসূরীর সামাজিক অবস্থান থাকে না, তাই তাদের মাথায় সম্মান বা মর্যাদার মতো আপেক্ষিক বিষয়গুলো চিন্তা-চেতনায় একেবারে রাখেন না। তাদের মননে ও মগজে একমাত্র অর্থ উপার্জন ব্যতীত রাজনীতিতে কাজ করে না বিধায় তারা রাজনীতির ইতিবাচক ধারায় না ঘুরে অর্থ আয়ের লক্ষ্যে সময় ও মেধা ব্যয় করেন। তারা দ্রুতই সমাজ বিরোধী কার্যক্রমকে এক প্রকার বৈধতার সনদ দিয়ে সিনিয়র নেতাদের প্রিয় ভাজন হয়ে উঠেন। আর তখনই বিদেশী সক্রিয় চক্র থেকে শুরু করে দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীরা সাধারন জনগণকে এক এগারো (১১/১) বা জুলাই অভ্যুত্থানের পথে বিবিধ প্ররোচণায় হাতে নিতে সক্ষম হন। পরিতাপের বিষয় রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা রাজনীতিতে যখন নিজেদের ভুল চোখে না দেখে শুধু সরষেফুল দেখেন, তখন জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েও পার পাওয়ার কোন সুযোগ থাকে না।
এখন প্রশ্ন হলো "রাজনীতির জীবন চক্র কি তাহলে এমনই হয়?" এক কথায় উত্তর হলো না।
প্রাচীন দার্শণিক এরিস্টোটল, প্লেটো থেকে শুরু করে হালের রাষ্ট্র বিজ্ঞানীরাও রাজনীতিকে সমাজ বিরোধী কোন শব্দে সংজ্ঞায়িত করেননি। কেননা সমাজ থেকেই রাষ্ট্রের উৎপত্তি তাই সমাজের মানুষকে অসহিষ্ণু করে রাজনীতি করা অসম্ভব। আমাদের স্বাধীন দেশে ছাত্র রাজনীতির গলায় যখন থেকে খড়গ নেমে এসেছে, তখন থেকেই দেশে রাজনীতির মান ও গুণে ক্রমাবনতি শুরু হয়েছে। রাজনীতির এই পঙ্কিল পথে এখনো যারা রাজনীতিকে ইতিবাচক ধারায় ধারণ ও দূতের মতো বহন করে চলেছেন সূক্ষ্মভাবে বিচার করলে দেখবেন তারাই রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশী নিগৃহিত ও অপ্রয়োজনীয় হিসাবে বিবেচিত হচ্ছেন। তাই ভাবার অবকাশ নেই রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ও দলীয় বিভেদ না মিটিয়ে কেউ হুইসেল বাজালেই জনগণ মাঠে নেমে পড়বেন এমনটা ভাবা ঠিক হবে না বরং তৃণমূল নেতা কর্মীরা নিজ দলীয় সন্ত্রাসী ও অর্থ লিপসু লোকদের দ্বারা ঘটে যাওয়া অত্যাচার ও নির্যাতনের অতীত ইতিহাস দশ বার স্মরণ করবেন। ফলে সকল পরিকল্পণা বুমেরাং হয়েই পুনরায় আঘাত হানতে পারে এমনটা হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।
লেখক: মীর্জা বাহাদুর
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।