ইবাদতে স্বাদ পাওয়ার ৫ উপায়

ইবাদতে স্বাদ পাওয়ার ৫ উপায়

ফাইল ছবি

আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করি যেখানে সবসময় নিজের সেরাটা দেওয়ার প্রত্যাশা করা হয়। যত দূর সম্ভব আমাদের কাজ করতে হয় এবং তা করতে হয় সেরা উপায়ে। পার্থিব এসব কাজেই আমাদের সব শক্তি ব্যয় হয়ে যায়। দুনিয়ার কাজ শেষ করার পর আমরা প্রায়ই ক্লান্ত হয়ে পড়ি। অবসাদ ঘিরে ধরে। কখনো কখনো ইবাদতকে বোঝা মনে হয়। বাধ্যতামূলক সর্বনিম্ন ইবাদতটুকুও ভারী মনে হয়। যত দ্রুত সম্ভব শেষ করার চেষ্টা করি। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব?

ইবাদত হোক শক্তির উৎস

আমাদের ইবাদতকে শক্তির উৎসে রূপান্তরিত করতে হবে। প্রশ্ন হলো, কীভাবে?

মূল সমস্যা হলো, পার্থিব কাজের যে মানদণ্ড, আমরা তা দিয়েই ইবাদতের বিচার করি। অর্থাৎ একে শুধু একটি কাজ হিসেবে দেখি যা শেষ করতে হবে। অথচ একই সঙ্গে এই কাজে উৎকর্ষ অর্জনের জন্য আমরা পার্থিব কাজের মতো সেই উদ্দীপনা দেখাই না।

কেন এমন হয়?

কারণ ইবাদতের তাৎক্ষণিক ফল আমরা সবসময় দেখতে পাই না। তাই প্রথমত, ইবাদত সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বা ধারণায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

নামাজ পড়া জরুরি, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা নামাজ সম্পর্কে কী বলেছেন? এটি প্রথমত এবং প্রধানত আমাদের নিজেদের ভালোর জন্যই। নামাজ আমাদের জন্য কল্যাণকর।

দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আমাদের সৃষ্টিগত মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে পুনর্সংযোগ ঘটিয়ে দেয়। আর সেই উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর বান্দা হওয়া এবং তার ইবাদত করা।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আমাদের ভেতর শক্তি জোগাতে পারে। এগুলো আমাদের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। এই ব্যস্ত পৃথিবীতে আমাদের মনকে দেয় প্রশান্তি ও সন্তুষ্টি।

নামাজকে যদি আমরা এভাবে দেখতে পারি, তবে আমরা এর দিকে ছুটে যাব। এক ওয়াক্ত শেষ হলে অন্য ওয়াক্তের জন্য অপেক্ষা করব। রবের সামনে দাঁড়ানো এবং তার সঙ্গে কথা বলাই হয়ে উঠবে আমাদের শক্তির মূল উৎস।

এক অসাধারণ পরিবর্তন

আমরা প্রতিনিয়ত ভাবনায় ডুবে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। আর যখন কোনো ভাবনা থাকে না, তখন আমরা বিনোদনে মত্ত হই। আমাদের জীবনে কোনো বিশ্রামের সময় নেই, কোনো নিস্তব্ধতা নেই। এমনকি ইবাদতের সময়ও আমাদের চিন্তাভাবনা ছুটতে থাকে। ফলে আল্লাহমুখী মন ও হৃদয়ের যে আত্মিক অনুভূতির কথা বলা হয়েছে, তার স্বাদ না পেয়েই আমরা শুধু যান্ত্রিকভাবে নিয়মগুলো পালন করে যাই।

আবারও বলা যায়, ইবাদতকে আশ্রয় হিসেবে দেখা উচিত। আমাদের নিজস্ব ব্যস্ততা থেকে এক চিলতে আশ্রয়। শুরুটা এভাবে হতে পারে—সেজদার সময় আল্লাহর সঙ্গে হৃদয়ের সংযোগ অনুভব করার চেষ্টা করা। রবের সঙ্গে সেই আত্মিক সংযোগ অনুভব করা পর্যন্ত সেজদায় থাকার চেষ্টা করুন। এভাবেই হবে এক অসাধারণ পরিবর্তনের সূচনা; যেখানে নামাজ শুধু একটি বাধ্যবাধকতা না থেকে হয়ে উঠবে আমাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন।

ইবাদতের অন্যান্য মাধ্যম

ইবাদতকে বোঝা বা ভারী বাধ্যবাধকতা মনে না করে ব্যক্তিগত প্রয়োজন হিসেবে দেখার অর্থ এই নয় যে, আমরা দুনিয়ার কাজকর্ম থেকে হাত গুটিয়ে নেব। আমাদের পার্থিব অনেক দায়িত্ব রয়েছে। অন্যান্য মানুষ, সন্তান, জীবনসঙ্গী ও মা-বাবার আমাদের ওপর অধিকার রয়েছে। আর তাদের এই অধিকার রক্ষা করা ও দায়িত্ব পালন করা সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া এটিও ইবাদতেরই একটি অংশ।

এখানে সঠিক নিয়ত বা উদ্দেশ্যই হলো আসল বিষয়, পাশাপাশি প্রয়োজন আন্তরিকতা। আমাদের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো বুঝতে হবে এবং প্রতিটি কাজের মাঝেই রবের সঙ্গে সংযোগ অনুভব করার চেষ্টা করতে হবে।

এর একটি উপায় হলো, সকালে উঠেই সারা দিন আল্লাহকে স্মরণ করার নিয়ত করা। আর যখনই মনে হবে আল্লাহর সঙ্গে সংযোগ মজবুত করা দরকার, তখনই সেই নিয়ত নবায়ন করে নেওয়া।

নিজের সীমাবদ্ধতা জানুন

ইবাদতের ক্ষেত্রে নিজের সীমানা বা ক্ষমতার কথা জানাও জরুরি। তালিকায় থাকা সব কিছু যে আমাদের করতেই হবে, তা নয়। যদি রোজা রাখা আপনার জন্য সহজ হয়, তবে আপনি মাস বা বছরজুড়ে বেশ কিছু নফল রোজা রাখতে পারেন।

তবে রোজা রাখা যদি আপনার জন্য সত্যিই অনেক কঠিন হয়, তবে এমন কোনো ইবাদত বেছে নিতে পারেন যা আপনাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে। হতে পারে তা অতিরিক্ত দান-সদকা করা। কিংবা রাতে তাহাজ্জুদ নামাজের জন্য জেগে ওঠা যদি আপনার জন্য সহজ হয়, তবে সেটি করতে পারেন। অথবা বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করতে পারেন।

নিজেকে জানুন। দয়াময় রবের প্রিয় পাত্র হতে আপনি কী করতে পারেন, তা বোঝার চেষ্টা করুন। যেসব সুন্নত বা নফল ইবাদত আপনার জন্য পালন করা কঠিন, সেসব নিয়ে নিজের ওপর জোরপূর্বক অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

তুলনা করুন শুধু নিজের সঙ্গেই

ইবাদতকে যেন বোঝা মনে না হয়, সে জন্য অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করা বন্ধ করা জরুরি। আমাদের নিজেদের শক্তি ও দুর্বলতার জায়গাগুলো জানা উচিত। অন্য মানুষের শক্তি ও দুর্বলতা আবার ভিন্ন হতে পারে।

নিয়মিত নিজেকে উন্নত করার চেষ্টা করুন, তবে নিজের প্রতি সদয় হন। নিজেকে চিনুন। আপনার কোরআন তিলাওয়াতের মান বাড়ান। আপনি যদি এখন দিনে এক পৃষ্ঠা পড়েন, তবে তা বাড়িয়ে দুই পৃষ্ঠা করার চেষ্টা করুন। তারপর দুই পৃষ্ঠা পড়াকেই অভ্যাসে পরিণত করুন, যতক্ষণ না তা আপনার জীবনের অংশ হয়ে যায়। এরপরই কেবল পড়ার পরিমাণ আরও বাড়াতে পারেন।

আল্লাহ তায়ালা সেই আমলকেই বেশি ভালোবাসেন যা নিয়মিত করা হয়, তা পরিমাণে কম হলেও। নিজেকে অতিরিক্ত ভারাক্রান্ত করা এড়িয়ে চলুন, কারণ এটি পরবর্তীতে আপনার ইবাদতের ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের অবনতি ঘটাতে পারে।