স্কুল সহপাঠীকে খুঁজতে অভিনব পোস্টারিং

স্কুল সহপাঠীকে খুঁজতে অভিনব পোস্টারিং

সংগৃহীত

‘স্বপ্না, তুমি যদি কোথাও থেকে এই পোস্টারটি দেখো, একবার শুধু যোগাযোগ করো। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তোমার সঙ্গে একবার দেখা হওয়ার অপেক্ষায় থাকব’— স্কুল সহপাঠীকে খুঁজতে এমন বার্তা লিখে ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার জিরাবোর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় পোস্টার সাঁটিয়েছেন মো. মাসুদ নামের এক ব্যক্তি।

সম্প্রতি আশুলিয়ার জিরাবো এলাকায় স্পেকট্রাম গার্মেন্টস এলাকায় গিয়ে এমন পোস্টারের দেখা মেলে। ওই এলাকায় সড়কের পাশে, দেয়ালে, বিদ্যুতের খুঁটিতে ওই পোস্টার সাঁটানো হয়েছে। অভিনব পোস্টারটি নজর কেড়েছে অনেকের।

পোস্টারে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই দশক আগে হারিয়ে যাওয়া এক স্কুল সহপাঠীকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা হিসেবেই টাঙানো হয়েছে পোস্টারটি।

পোস্টারের শিরোনামে বড় অক্ষরে লেখা, ‘স্বপ্না’, ‘স্বপ্না’। নিচে লেখা, ‘একটি মানুষকে খুঁজছি, যদি কেউ চিনে থাকেন, দয়া করে জানাবেন।’

এরপর পুরো পোস্টারে লেখা হয়েছে, ‘২০০৭ সালে জিরাবো স্কুলে ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময় স্বপ্না নামের এক সহপাঠী ছিল। তার গালে একটি তিল ছিল। তার গ্রামের বাড়ি বগুড়া গাইবান্ধা। তখন ২০০৭ সালে তার মা এবং ছোট ভাইকে নিয়ে মাসু দেওয়ান এর বাড়ির পিছনে কয়েকটি বাড়ির মধ্যে যেকোনো একটু বাড়িতে ভাড়া থাকতো, নির্দিষ্ট করে জানা নেই কোন বাড়ি। তখনকার সময় ঈদের ছুটির পরে সে হঠাৎ করে স্কুলে আসা বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে জানতে পেরেছি, তার বাসার কাছেই একটি প্রিন্ট ফ্যাক্টরিতে চাকরি নেয়। বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে কয়েকবার সেই প্রিন্ট ফ্যাক্টরি গেটে গিয়েও তার দেখা পাইনি।’

‘পরবর্তীতে যতদূর জানতে পেরেছি, সে জিরাবো সাউদার্নের পাশে একটি ফ্যাক্টরিতে চাকরি নিয়েছিল এবং সর্বশেষ জানতে পেরেছি ২০১৬ সালের পর থেকে দীর্ঘদিন পুকুরপাড় কন্টিনেন্টাল গার্মেন্টসে ও ইনসেপ্টার পাশে সাউথঅনে কিছুদিন চাকরি করেছে। আমি বিভিন্ন সময় ওই ফ্যাক্টরিগুলোর গেটে গিয়ে খোঁজ খবর নিয়েছি। কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত কখনোই তার সাথে আর দেখা হয় নাই। যদি কেউ তাকে বা তার কোন আত্মীয়-স্বজনকে চিনে থাকেন, তবে অনুগ্রহ করে আমাকে জানানোর অনুরোধ রইলো।’

‘আমিও লেখাপড়া শেষ করে কর্মজীবনে পাড়ি জমিয়েছি দীর্ঘদিন যাবত। ২০১৮ সাল থেকে একটা ফ্যাক্টরির টেকনিক্যাল ম্যানেজার মার্কেটিং এর দায়িত্ব পালন করে আসছি।’

‘সেই চাকরির সুবাদে ১/৭/২০২৬ তারিখ হতে এখান থেকে অনেক দূরে মাওনা শ্রীপুর চৌরাস্তা গাজীপুর চলে যেতে হচ্ছে। আর কোনোদিন হয়তো স্বপ্নার জন্য কোনো গেটে দাঁড়িয়ে স্বপ্নার খোঁজ নেওয়া সম্ভব হবে না। তাই, স্বপ্নাকে খুঁজে পাওয়ার সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে এই পোস্টার ছাপানো।’

‘আমি জানি, স্বপ্না তুমি জিরাবো অথবা পুকুরপাড়ের মধ্যেই কোথাও আছো। তাই, স্বপ্না কোনোদিন যদি আমার এই লেখাগুলো তোমার চোখে পড়ে, দয়া করে আমার সাথে একবার যোগাযোগ করিয়ো। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তোমার সাথে একবার দেখা হওয়ার অপেক্ষায় থাকবো।’

পোস্টারের নিচে নাম লেখা হয়েছে, মো. মাসুদ রানা। আর যোগাযোগের জন্য যুক্ত করা হয়েছে একটি মুঠোফোন নম্বর- ০১৬০৫৬৭৮৫৭৫।

দেয়ালে সাঁটানো পোস্টারে দেওয়া ফোন নম্বরে কল দিলে ফোনটি রিসিভ করেন সেই মো. মাসুদ রানা। তিনি বলেন, “আমি মাওনা এলাকায় একটি কারখানায় চাকরি করছি। ছোটবেলায় জিরাবো এলাকায় পড়াশোনা করেছি। আমার সঙ্গে স্কুলে পড়তো সেই বান্ধবী। আমি তাকে পছন্দ করতাম। তবে, কখনো সেভাবে কথা বলতে পারিনি। পরবর্তীতে আমি তাকে হারিয়ে ফেলি। তার নাম্বার বা ছবি আমার কাছে নেই। যতদিন ওই এলাকায় ছিলাম, নানাভাবে তাকে খোঁজার চেষ্টা করেছি। পরবর্তীতে আমি মাওনা চলে আসি। ফলে, এখন তো আর ঘুরে ঘুরে খোঁজা সম্ভব নয়। তাই, পোস্টার ছাপিয়েছি। তবে, এখনো তাকে খুঁজে পাইনি।”

মাসুদ রানার চাওয়া, একবারের জন্য হলেও হারিয়ে যাওয়া পুরনো বন্ধুর সঙ্গে যেন তার দেখা হয়। সেই উদ্দেশ্যেই এমন পোস্টার।

অভিনব কায়দায় সহপাঠী নারী বন্ধুকে খোঁজার এ পোস্টারটি নজর কেড়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। এটি ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও।

আশুলিয়ার জিরাবো স্পেকট্রাম কারখানার সামনে এমনই এক পোস্টার দেখছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আমিনুর রহমান। তিনি বলেন, “আগে গানে-কবিতায় শহর জুড়ে পোস্টার সাঁটানোর কথা শুনেছি। এখন সত্যি এমন একটি ঘটনা দেখলাম। খুব করে চাই, তাদের দেখা হোক।”

একই কথা বললেন স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক পোস্টার হরহামেশাই দেখি। কিন্তু, এমন পোস্টার কখনো দেখিনি।”