যেভাবে বাঁচলো অসহায় শিশু রিয়ার জীবন

যেভাবে বাঁচলো অসহায় শিশু রিয়ার জীবন

সংগৃহীত ছবি

রিয়া আক্তারের বয়স মাত্র ১১ বছর। বাবা-মায়ের পরিচয় বলতে পারে না। বাবা বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন, সেটিও জানেন না পরিবারের সদস্যরা। মায়েরও অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে গেছে। দরিদ্র দাদা-দাদির কাছে আশ্রয় নেওয়া রিয়ার দিন কাটছিল চরম অনিশ্চয়তায়। একসময় খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে তাদের। তাই রিয়াকে অন্যের বাসায় কাজে দেওয়ার অনুরোধ করেন তারা।

এমন অবস্থায় রিয়াকে নিয়ে আসেন কুমিল্লার কাঠ ব্যবসায়ী মো. লিটন। তার বাড়ি নোয়াখালীর মাইজদী পৌর এলাকায়। বর্তমানে তিনি কুমিল্লার লালমাই উপজেলার ভুশ্চি বাজার এলাকায় থাকেন। রিয়ার দাদার বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার বাংলা বাজার এলাকায় বলে জানা গেছে।

লিটন জানান, কাঠ কিনতে গেলে রিয়ার পরিবারের সদস্যরা তাকে বাসার কাজে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। এরপর তিনি রিয়াকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। কিন্তু তার কাছে আসার পর দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয় রিয়া। টিনে পড়ে তার ডানহাত প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

প্রথমে তাকে লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা প্রথমে তাকে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় লিটন তাকে ঢাকায় নিতে পারছিলেন না।

পরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মির্জা তাইয়্যেবুল ইসলাম রিয়ার পরিবারের অবস্থা জানতে পেরে তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। গত ১২ আগস্ট তার অস্ত্রোপচার করা হয়। এই অস্ত্রোপচার না হলে রিয়ার হাত ও জীবন দুটোই ঝুঁকিতে পড়ত বলে জানান চিকিৎসকেরা।

লিটন বলেন, ‘রিয়ার সঙ্গে হাসপাতালে থাকায় আমার সব আয় বন্ধ হয়ে গেছে। ওষুধ ও পথ্য জোগাড় করতেও কষ্ট হচ্ছে। রিয়ার চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা প্রয়োজন।’

মঙ্গলবার কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চতুর্থ তলায় গিয়ে দেখা যায়, রিয়ার পাশে রয়েছেন লিটন ও তার স্ত্রী সুলতানা বেগম। তারা বাবা-মায়ের মতোই রিয়ার যত্ন নিচ্ছেন। পাশে ছিল তাদের আট বছরের মেয়ে মীম ও দুই বছরের ছেলে ফরহাদ।

এ সময় লিটন যখন এই প্রতিবেদককে বলেন, রিয়াকে কোথাও কাজে দেওয়ার জন্য তিনি নিয়ে এসেছিলেন। এ কথা শুনে রিয়া চোখ মুছতে থাকে। তখন লিটন তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘না, তোমাকে কোথাও দেব না। আমার কাছেই রেখে দেব।’ এরপর শান্ত হয় রিয়া।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই প্রথম এই ধরনের বড় অপারেশনের গল্প জানতে গিয়ে জানা যায়, রিয়ার বেড়ে ওঠার গল্পটিও কষ্টে ভরা। আর দুর্ঘটনার পর তার জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর মির্জা তাইয়্যেবুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনার পর রিয়ার ডান হাতে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাকে ঢাকায় রেফার করার কথা ভাবা হয়েছিল। তবে ঢাকায় পাঠালে হাতটি বাঁচানো সম্ভব হতো না। রিয়া এতিম জানার পর তারা অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের টিম নিয়ে আমরা অস্ত্রোপচারে নেমে পড়ি। প্রায় সাড়ে ৫ ঘণ্টার এ অপারেশনে হাতের মেজর দুটো রক্তনালী, তিনটা মেজর নার্ভ আর হাতের প্রায় সব মাংসপেশি জোড়া লাগানো হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘রিয়া এখন ভালো আছে। সে আঙুল নাড়াচাড়া করতে পারছে। পুরোপুরি সুস্থ হতে একটু সময় লাগবে। তার পাশে থাকতে পেরে আমাদের ভালো লাগছে।’