রক্তের গ্রুপের সঙ্গেও স্ট্রোকের সম্পর্ক কী, বেশি ঝুঁকিতে যারা
রক্তের গ্রুপ
মানুষের জীবনপদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে। আবহাওয়া ও খাবারে বদল এসেছে। সুস্থ থাকার উপাদানগুলো প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এসব কারণে রোগ বালাই বাড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হৃদরোগের পাশাপাশি স্ট্রোক এখন বৈশ্বিক মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।প্রতি বছর হাজারও মানুষ হৃদরোগ ও স্ট্রোকে মারা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্ট্রোক হলে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম থাকে, আর যারা বেঁচে ফেরেন, তাদের অনেকেই আজীবনের জন্য পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
চিকিৎসকদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ, অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, ধূমপান, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা—এসবই স্ট্রোকের বড় ঝুঁকির কারণ। পাশাপাশি অতিরিক্ত মদ্যপান, শারীরিক অনিষ্ক্রিয়তা, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, ঘুমজনিত ব্যাধি (যেমন স্লিপ অ্যাপনিয়া), এমনকি হৃদরোগও স্ট্রোকের আশঙ্কা বাড়াতে পারে। পরিবারের কারও স্ট্রোকের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়, তাই চিকিৎসকরা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন।
সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে নতুন ও চমকপ্রদ এক তথ্য। রক্তের গ্রুপও স্ট্রোকের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। ২০২২ সালে নিউরোলজি জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, রক্তের ‘এ’ গ্রুপের একটি বিশেষ ধরন, ‘এ১’, থাকা ব্যক্তিদের ৬০ বছর বয়সের আগেই স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি অন্যান্য রক্তের গ্রুপের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি।
একই গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ‘বি’ গ্রুপের রক্তের মানুষের ক্ষেত্রেও স্ট্রোকের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি—প্রায় ১১ শতাংশ বেশি ঝুঁকি থাকে। অপরদিকে, যাদের রক্তের গ্রুপ ‘ও১’, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি ১২ শতাংশ কম।
গবেষণাটি ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। এতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগৃহীত ৪৮টি জেনেটিক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে প্রায় ১৭ হাজার স্ট্রোক আক্রান্ত ব্যক্তি এবং ৬ লাখ সুস্থ মানুষের তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ১৮ থেকে ৫৯ বছরের মধ্যে।
যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিশেষজ্ঞ ও গবেষণার প্রধান লেখক ড. স্টিভেন কিটনার বলেন, আমরা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নই কেন রক্তের ‘এ’ গ্রুপ স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে এটি সম্ভবত রক্ত জমাট বাঁধা, প্লাটলেটের কার্যকারিতা, রক্তনালির ভেতরের কোষ এবং কিছু নির্দিষ্ট প্রোটিনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান, পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক ছিলেন। তবে ইউরোপীয় বংশোদ্ভূতদের সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি—প্রায় ৬৫ শতাংশ। তাই গবেষকরা বলছেন, ভবিষ্যতে আরও বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর ওপর গবেষণা করলে এই সম্পর্ক আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তের গ্রুপ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, তবে স্ট্রোকের প্রধান ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাই রক্তের গ্রুপ নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান ত্যাগ, নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং অ্যালকোহল গ্রহণ সীমিত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
যেসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে—
মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া
এক হাত বা এক পা দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া
কথা জড়িয়ে যাওয়া বা কথা বলতে না পারা
হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া
তীব্র মাথাব্যথা
ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা