ভর্তুকি ও বকেয়ার চাপে বিদ্যুৎ খাত
ফাইল ছবি
বিদ্যুৎ খাতে বিপুল অর্থ ঢেলেও সংকটের স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। প্রায় ১৮ মাসের দায়িত্বকালে পুরোনো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিল পরিশোধ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় মেটাতে সরকারকে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সরকারের কাছ থেকে নগদ ভর্তুকি পেয়েছিল ৫৪ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। এর পরও ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সরবরাহকারীর কাছে মোট বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, ‘জ্বালানিসংকটের মূল কারণ দীর্ঘদিনের ভুল নীতি ও আমদানিনির্ভরতা। আওয়ামী লীগ সরকারের মতোই একই পথে হেঁটেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সেই উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সংকট সামাল দিতে আমাদেরও বেগ পেতে হচ্ছে।’ অর্থ বিভাগ বলছে, ৫৪ হাজার কোটি টাকা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নগদ ভর্তুকি, আর ৫২ হাজার কোটি টাকা ২০২৬ সালের এপ্রিলের বকেয়া রয়েছে। আগের সরকারের ১৬ বছরের জেরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসের জের। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ইউনূস সরকারের সময় গেছে পুরোনো বিল পরিশোধ ও সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার কাজে। কিন্তু আগের বিল পরিশোধ করতে গিয়ে চলতি বিল পরিশোধ না করায় তা বকেয়া পড়েছে। যার চাপ এসে পড়েছে এখন বিএনপি সরকারের ঘাড়ে।
ভর্তুকি কমলেও ঘাটতি কমেনি : ২০২৪ সালের শেষ দিকে ভারতের আদানি পাওয়ারের পাওনা প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেয়। তখন সরকারকে বেশি দামে তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ আদানির পাওনার বড় অংশ পরিশোধ করে। ২০২৫ সালের জুনে প্রায় ৪৩৭ মিলিয়ন ডলার পরিশোধের মাধ্যমে স্বীকৃত পুরোনো বকেয়ার বড় একটি অংশ নিষ্পত্তি করা হয়। এভাবে পুরোনো বকেয়া পরিশোধ হয়, কিন্তু নতুন বকেয়া তৈরির কাঠামো বদলায়নি। ফলে ভর্তুকি কমলেও ঘাটতি কমেনি।
সূত্র জানায়, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মোট বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৩০০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে গ্যাস বিল, দেশীয় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র এবং ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের বিল রয়েছে।
বাড়ানো হয়নি উৎপাদন : অর্থ বিভাগ বলছে, সবচেয়ে বড় অস্বাভাবিকতা হলো উৎপাদন সক্ষমতা ও বাস্তব উৎপাদনের ব্যবধান। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে দেশের স্থাপিত গ্রিড বিদ্যুৎ সক্ষমতা ছিল ২৭ হাজার ৪১৪ মেগাওয়াট, অথচ সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৬ হাজার ৬০৩ মেগাওয়াট। অর্থাৎ প্রায় ১০ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা সর্বোচ্চ উৎপাদনের বিষয়টি কাজে লাগানো হয়নি।
দুশ্চিন্তা জ্বালানি নিরাপত্তায় : দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনো গ্যাস, কয়লা, এলএনজি ও তরল জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অথচ দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমছে এবং আমদানি নির্ভরতা বাড়ছে। সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশের গ্যাস উৎপাদন কমেছে, ফলে উৎপাদন ও চাহিদার ব্যবধানও বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১৬ হাজার ৪০৭ গিগাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ আমদানি করেছে। মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ১৬ শতাংশ এসেছে বিদেশ থেকে। অর্থাৎ দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিদেশি বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা থেকে গেছে।
১৫ সেপ্টেম্বরের পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে : বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের পর দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে। গতকাল সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, চলতি মাসের আর কিছুদিন পরই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতির একটা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করব বলে আশা করছি। আমাদের দুটো এফএসআরইউ, তার মধ্যে একটি গত ২১ জুলাই নষ্ট হয়ে যায়। সেটি ১৫ আগস্ট ঠিক হয়ে যাওয়ার পরও সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে পারিনি। কারণ আমাদের যে কার্গোগুলো আমদানি করতে হয়, সেগুলো রিসিডিউল করতে হয়েছিল। এখন পর্যন্ত ৮৮ শতাংশ সরবরাহ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারলেও বাকি ১২ শতাংশ এখনো পারিনি। আশা করছি দ্রুত এটা করে ফেলব।
বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ মুহূর্তে পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বন্ধ রয়েছে এবং রামপালের একটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। কারণ তাদের যে কয়লা আসার কথা ছিল, সে লাইটারেজ বঙ্গোপসাগরে আছে। কিন্তু লাইটারেজ করে কয়লা মোংলাতে আনতে হয়। বঙ্গোপসাগর এ মুহূর্তে কিছুটা অশান্ত, সে কারণে কয়লা আনা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, আবহাওয়া কিছুদিনের মধ্যে ভালো হবে। সে ক্ষেত্রে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় যদি আসে এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা যদি স্বাভাবিক করতে সক্ষম হই তাহলে এর সুবিধা বিদ্যুৎ বিভাগ পাবে। সে ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ খাতে একটা উন্নতি দেখব। শিল্প খাতে যারা এ মুহূর্তে কিছুটা হলেও ভোগান্তির শিকার এবং এমনকি গৃহস্থালি গ্রাহকরাও যে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন তাদের ভোগান্তিও কমবে বলে আশা করছি।
আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ অর্ধেকে নেমে এসেছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, তাদের সঙ্গে আমরা নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি, যাতে করে তারা পূর্ণ সক্ষমতা অর্থাৎ আমাদের যে পরিমাণ বিদ্যুৎ দেওয়ার কথা, সে পরিমাণ বিদ্যুৎ যেন আমরা পাই। দিনের বেলা আদানি এখন পর্যন্ত ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেয়। সন্ধ্যার পর থেকে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট দেয়। কিন্তু স্বাভাবিক সময়ে গড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ আমরা আদানির কাছে পেতাম। কয়লা সরবরাহের ক্ষেত্রে আদানি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ দেখিয়েছে। সে সংক্রান্ত ছবি এবং ডকুমেন্টও আমাদেরকে সরবরাহ করেছে। তাদের এ বক্তব্যগুলো যৌক্তিক মনে হয়েছে। গ্যাসসংকট প্রসঙ্গে প্র্রতিমন্ত্রী বলেন, গ্যাসের ক্ষেত্রে ৮৮ শতাংশ সরবরাহ ব্যবস্থা রিকভার (পুনরুদ্ধার) করতে সক্ষম হয়েছি, মাত্র ১২ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। ১২ শতাংশ ঘাটতি আমরা মোকাবিলা করে ফেলব। সরকার বাধ্য হয়ে বেশি দামে এলএনজি কিনছে বলে জানিয়েছেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, আমাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি চুক্তি যাদের সঙ্গে ছিল, তারা সবাই ফোর্স মেজার ডিক্লেয়ার করেছে। ফলে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। স্পট মার্কেটে দাম বরাবরই বেশি হয়। কিন্তু মানুষের কষ্ট হচ্ছে, শিল্পকারখানা ভুগছে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে উচ্চমূল্য দিয়ে হলেও সরকার এলএনজি সংগ্রহ করছে।