লোভ মানব জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে
প্রতীকী ছবি
যেসব প্রবণতা মানুষের বিবেক, ন্যায়বোধ ও আল্লাহভীতিকে গ্রাস করে নেয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো লোভ-লালসা। এই ভাইরাস একবার কাউকে পেয়ে বসলে সে আর মানুষের মতো আচরণ করে না।
অর্থ-সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা মর্যাদার জন্য সে অন্যের অধিকার হরণ, প্রতারণা, নির্যাতন এমনকি হত্যার মতো অপরাধেও জড়িয়ে পড়তে পারে। তাদের কাছে তখন স্বার্থ উদ্ধারই মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠে। স্বার্থের জন্য তারা ঈমান বিকিয়ে দিতেও দ্বিধাবোধ করে না। (নাউজুবিল্লাহ)
অর্থ-সম্পদের প্রতি ভালোবাসা প্রতিটি মানুষের মধ্যেই কমবেশি থাকতে পারে, এটা মানুষের স্বভাবজাত বিষয়।
পবিত্র কোরআন মানুষের এই দুর্বলতার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা ধন-সম্পদকে অত্যধিক ভালোবাসো।’ (সুরা : ফজর, আয়াত : ২০)
এই ভালোবাসা যখন অতিরিক্ত আসক্তিতে রূপ নেয়, তখনই তা মানুষকে ন্যায়-অন্যায় ভুলিয়ে দেয়। তারা তখন অর্থ-সম্পদ, ক্ষমতা ও মর্যাদার জন্য সব ধরনের পাপ করতে প্রস্তুত হয়ে যায়। অর্থের প্রতি এই অন্ধ আসক্তিই মানুষকে কখনো অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করতে, কখনো ঘুষ-দুর্নীতিতে জড়াতে এবং কখনো নিজের স্বার্থে অন্যের জীবন, সম্মান ও নিরাপত্তাকে তুচ্ছ করতে প্ররোচিত করে।
অথচ মহান আল্লাহ অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ হস্তগত করাকে হারাম করেছেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)
কখনো কখনো দেখা যায়, মানুষ সরাসরি ছিনতাই না করলেও আদালত কিংবা আইনের প্যাঁচে ফেলে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি গ্রাস করার পাঁয়তারা করে। অথচ উৎকোচ দিয়ে কিংবা ক্ষমতাবলে অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ গ্রাস করার জন্য যদি আদালত থেকে রায় নিয়ে আসে, তবু তা অবৈধই থেকে যাবে। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আর তোমরা নিজেদের মধ্যে তোমাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না এবং তা বিচারকদের (ঘুষ হিসেবে) প্রদান কোরো না।
যাতে মানুষের সম্পদের কোনো অংশ পাপের মাধ্যমে জেনেবুঝে খেয়ে ফেলতে পারো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৮)
লোভ-লালসা মানুষের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। বিশেষ করে এগুলো মানুষের দ্বিন-ধর্মের ক্ষতি করে। এর ক্ষতি সম্পর্কে সতর্ক করতে গিয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, কাব ইবনে মালিক আল-আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দুটি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘকে ছাগলের পালে ছেড়ে দেওয়া হলে পরে তা যতটুকু না ক্ষতিসাধন করে, কারো সম্পদ ও প্রতিপত্তির লোভ এর চেয়ে বেশি ক্ষতিসাধন করে তার ধর্মের। (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৭৬)
উল্লিখিত এই হাদিসে মহানবী (সা.) অর্থ-সম্পদের লোভের পাশাপাশি মর্যাদা ও ক্ষমতার লোভকেও একই বিপদের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। কারণ ক্ষমতার লোভ যখন বিবেককে পরাজিত করে, তখন মানুষের কাছে অন্যের সম্মান, অধিকার, নিরাপত্তা এমনকি জীবনও নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে তুচ্ছ হয়ে যেতে পারে।
লোভ-লালসার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো, এটি মানুষকে কখনোই তৃপ্ত হতে দেয় না। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, হাকিম ইবনে হিযাম (রা,) থেকে বর্ণিত, আমি মহানবী (সা.)-এর কাছে কিছু চাইলাম। তিনি আমাকে দিলেন। আমি তাঁর কাছে আবার চাইলাম। তিনি আমাকে দিলেন। আমি তাঁর কাছে আবার চাইলাম। তিনি দিলেন। এরপর বললেন, ...হে হাকিম! এ সম্পদ সবুজ ও সুমিষ্ট। যে লোক তা খুশিমনে গ্রহণ করবে, তার জন্য তাতে বরকত দেওয়া হবে। আর যে ব্যক্তি তা লালসা নিয়ে গ্রহণ করবে, তার জন্য তাতে বরকত দেওয়া হবে না। বরং সে ওই ব্যক্তির মতো যে খায়, কিন্তু তৃপ্ত না। আর ওপরের (দাতার) হাত নিচের (গ্রহীতার) হাত থেকে শ্রেষ্ঠ। (বুখারি, হাদিস : ৬৪৪১)
ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদ অর্জন নিষিদ্ধ নয়; বরং হালাল পথে উপার্জন, ন্যায়সংগত ভোগ ও তা থেকে আল্লাহর নির্দেশনা মোতাবেক খরচ করা প্রশংসনীয়। যে উপার্জনে আল্লাহর হুকমের ওপর লোভ-লালসাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে না। মনে রাখতে হবে, প্রকৃত প্রাচুর্যও সম্পদের আধিক্যে নয়, অন্তরের তৃপ্তিতে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত ধন-সম্পদ অধিক সামগ্রী থাকার মধ্যে নয়; প্রকৃত প্রাচুর্য হলো অন্তরের প্রাচুর্য।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪৪৬)
তাই আমাদের উচিত, আল্লাহকে ভয় করা, লোভ-লালসা ত্যাগ করা ও হালালভাবে প্রাপ্ত রিজিকের ওপর সন্তুষ্ট থেকে মহান আল্লাহর শোকর আদায় করা।