সরকারি স্কুলে ভর্তি ফি'র কমিশন-বাণিজ্যেই কি টিকে যাচ্ছে লটারি?
ফাইল ছবি
একটি সরকারি নীতিমালার সামান্য একটি ধারা—মাত্র ৫% ভাগের একটি সংখ্যা—আজ প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে দেশের পুরো সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর তারিখে সিনিয়র সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ স্বাক্ষরিত একটি নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, শিক্ষার্থী ভর্তি ফি বাবদ প্রাপ্ত মোট টাকা থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানের চুক্তিমূল্য বাদ দিয়ে অবশিষ্ট অর্থ তিন ভাগে ভাগ হবে—সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাবে ৮৫%, ভর্তি কমিটি পাবে ১০%, আর মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর পাবে ৫% (২%+৩%)। সংখ্যাটা কাগজে-কলমে ছোট দেখালেও, সারাদেশের হাজার হাজার সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর ভর্তি ফি হিসাব করলে এই ৫% মিলিয়ে দাঁড়ায় কোটি কোটি টাকায়। আর এই প্রশ্নটিই এখন সবচেয়ে জোরালোভাবে উঠছে—তাহলে কি এই কোটি টাকার কমিশনের স্বার্থেই লটারি প্রথা টিকিয়ে রাখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে একটি মহল?
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় তার শ্রেণিকক্ষে। সেই শ্রেণিকক্ষের দরজায় যখন মেধার বদলে ভাগ্যের লটারি বসানো হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—আমরা আসলে কী তৈরি করছি? একটি মেধাবী প্রজন্ম, নাকি একটি বিভ্রান্ত, বিশৃঙ্খল প্রজন্ম? সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়—বিশেষত জেলা শহরগুলোর ঐতিহ্যবাহী স্কুলগুলো—কখনোই শুধু ইটকাঠের প্রতিষ্ঠান ছিল না। এগুলো ছিল দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান-সংস্কৃতি, যেখানে কঠোর প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ পরীক্ষায় বাছাই করা শিক্ষকরা, প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় বাছাই করা শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে তুলতেন উৎকর্ষের ধারাবাহিক ঐতিহ্য। মেধাবী শিক্ষক ও মেধাবী শিক্ষার্থী মিলে শ্রেষ্ঠ ফলাফল তৈরি হওয়া কোনো কাকতালীয় বিষয় ছিল না, এটি ছিল সুপরিকল্পিত, প্রমাণিত একটি ব্যবস্থা।
কোভিড-১৯ মহামারী ছিল একটি জরুরি পরিস্থিতি, আর জরুরি পরিস্থিতিতে লটারি ছিল একটি সাময়িক সমাধান মাত্র। কিন্তু জরুরি ব্যবস্থা যখন বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে, তখন সেটি আর ব্যবস্থাপনা থাকে না—তা হয়ে দাঁড়ায় অব্যবস্থাপনার একটি স্থায়ী দলিল। আজ বাস্তবতা হলো: যে শিক্ষার্থী নিজের নামটি পর্যন্ত ঠিকমতো লিখতে পারে না, সে-ও ভাগ্যক্রমে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে এমন এক স্কুলে, যেখানে পাশের বেঞ্চের শিক্ষার্থী হয়তো ইতিমধ্যে গল্পের বই পড়া শুরু করে দিয়েছে। একজন শিক্ষক কি একই সময়ে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মানের শিক্ষার্থীকে ন্যায্যতা দিতে পারেন? উত্তরটা সবার জানা—না। ফলাফল: ধীরে ধীরে স্তিমিত হচ্ছে পাঠদানের মান, শ্লথ হচ্ছে ক্লাসের গতি, আর জেলা শহরের সরকারি স্কুলগুলোর দশকের পর দশকের অর্জিত সুনাম আজ ক্ষয়ে যাচ্ছে চোখের সামনেই।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—এই ক্ষয়ে লাভবান হচ্ছে কারা? আর সেই প্রশ্নের একটি স্পষ্ট আর্থিক ইঙ্গিত মেলে ওই নীতিমালাতেই। ভর্তি প্রক্রিয়া যত বড় পরিসরে, যত বেশি শিক্ষার্থী নিয়ে এবং যত দীর্ঘ মেয়াদে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হবে, মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কমিশন বাবদ আয়ও ততই বাড়বে। এই সহজ হিসাবটি মাথায় রাখলে বোঝা যায়, কেন একটি মহল লটারি প্রথা বন্ধ করার বদলে একে দীর্ঘায়িত করার পক্ষে এত সক্রিয়।
অথচ শিক্ষামন্ত্রী নিজে লটারির বিপক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন। এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহর সংসদীয় আহ্বানের প্রেক্ষিতে তিনি প্রথম শ্রেণিতে শুধু লটারি এবং দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তির সিদ্ধান্ত দিয়ে পরিপত্রও জারি করেছিলেন। এই ঘোষণায় দেশের প্রতিটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। একজন শিক্ষক হিসেবে বলতে দ্বিধা নেই—মেধাভিত্তিক ভর্তি পুনর্বহালের এই সাহসী পদক্ষেপ দীর্ঘদিন অবহেলিত সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এক আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছিল।
ঠিক এই কারণেই সাম্প্রতিক খবরটি আরও বেশি পীড়াদায়ক। জানা যাচ্ছে, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি প্রথা বহাল রাখার একটি প্রস্তাবনা প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে পাঠানো হচ্ছে—যদিও বিষয়টি এখনো প্রস্তাব পর্যায়েই আছে, চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রশ্ন হলো, শিক্ষামন্ত্রী নিজে যে ইতিবাচক অবস্থান নিয়ে পরিপত্র জারি করেছিলেন, তার সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী এই প্রস্তাবনা কীভাবে, কার উদ্যোগে তৈরি হচ্ছে? এটা কি আদৌ তাঁর সম্মতিতে হচ্ছে, নাকি প্রশাসনিক স্তরে কেউ ভর্তি ফি'র সেই কমিশনের স্বার্থে তাঁর সদিচ্ছাকে পাশ কাটিয়ে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে? এই প্রশ্নের স্বচ্ছ জবাব জাতির প্রাপ্য।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, যখনই ভর্তি পরীক্ষা ফিরিয়ে আনার কথা ওঠে, তখনই একটি নির্দিষ্ট মহল থেকে সমস্বরে যুক্তি আসে: "শিশুদের ওপর চাপ পড়বে", "কোচিং-নির্ভরতা বাড়বে"। প্রশ্ন হলো—এই মানবিক যুক্তির আড়ালে কি সত্যিই শিশুর কল্যাণচিন্তা কাজ করছে, নাকি কমিশন-বাণিজ্য রক্ষার একটি সুপরিকল্পিত স্বার্থ? বাস্তবতা কিন্তু ঠিক উল্টো—ভর্তি প্রস্তুতি একজন শিশুর মধ্যে প্রতিযোগিতার মানসিকতা তৈরি করে, তার ভিত মজবুত করে। অথচ এই সহজ সত্যটি চাপা দিয়ে, একটি সাজানো বয়ানের মাধ্যমে লটারি প্রথাকে "শিশুবান্ধব" হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে মিডিয়ায়, কলামে, টকশোতে—আর এই বয়ানের আড়ালেই চাপা পড়ে যাচ্ছে আসল প্রশ্নটি: কার আর্থিক স্বার্থে এই প্রস্তাব তৈরি হচ্ছে?
আরও একটি বাস্তবতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বেশিরভাগ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় শুরু হয় তৃতীয় শ্রেণি থেকে। একবার লটারিতে ভর্তি হয়ে গেলে সেই শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত ওই প্রতিষ্ঠানেই থেকে যাবে। ফলে ওপর থেকে যতই "ভর্তি পরীক্ষা ফিরছে" বলে প্রচার চালানো হোক না কেন, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে লটারি প্রথাই কার্যত টিকে থাকবে পেছনের দরজা দিয়ে—আর তার সাথে টিকে থাকবে কমিশনের সেই ধারাবাহিক আয়ও। ঘোষণা এক জায়গায়, বাস্তবায়নের প্রস্তাব অন্য জায়গায়—এই ফাঁকফোকরটিই আজ জনমনে বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাস তৈরি করছে, এবং এটি শিক্ষামন্ত্রীর নিজের সুনামের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াতে পারে।
যে সরকার শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এগিয়েছে, তাকে বুঝতে হবে—কমিশন-স্বার্থে তৈরি এই ধরনের অস্পষ্ট ও পশ্চাদমুখী প্রস্তাব জনরোষ তৈরির উপযুক্ত উপকরণ। প্রশাসনের ভেতরে এমন কিছু অংশ কি সক্রিয় আছে, যারা ভর্তি ফি'র আর্থিক স্বার্থ রক্ষায় সরকারকে জনবিচ্ছিন্ন করতে, শিক্ষা খাতে জনঅসন্তোষ উসকে দিতে সচেতনভাবে কাজ করছে? একটি ঘোষিত, ইতিবাচকভাবে গৃহীত সিদ্ধান্তকে এভাবে প্রস্তাবের মোড়কে উল্টে দেওয়ার প্রবণতা নিছক প্রশাসনিক জটিলতা বলে মেনে নেওয়া কঠিন। সচেতন অভিভাবক ও শিক্ষকরা ইতিমধ্যে এই প্রস্তাবের সমালোচনা করছেন, কোথাও কোথাও মানববন্ধনও হচ্ছে এবং এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি একটি সংগঠিত, ন্যায্য দাবির বহিঃপ্রকাশ। সরকার যদি এখনই এই প্রস্তাবনা প্রত্যাহার না করে এবং সারাদেশে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ঘোষিত ভর্তি পরীক্ষা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন না করে, তাহলে এই সমালোচনা কেবল বিস্তৃতই হবে না—তা সরকারের শিক্ষা-সংস্কার ভাবমূর্তির জন্যও একটি বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াবে।
শিক্ষা কোনো লটারির টিকিট নয়, আর ভর্তি ফি কোনো মন্ত্রণালয়ের বাড়তি আয়ের উৎস হতে পারে না। এটি জাতি গঠনের হাতিয়ার। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের অর্জিত সুনাম, তার বাছাই করা মেধাবী শিক্ষকমণ্ডলী এবং তাদের বিশেষায়িত পাঠদান পদ্ধতি—এই পুরো বাস্তুতন্ত্রটি রক্ষা করতে হলে মেধাভিত্তিক ভর্তি প্রক্রিয়া পুনর্বহাল করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সরকারকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে মেধাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষা করবে, নাকি কমিশন-স্বার্থের প্রস্তাবের কাছে নতিস্বীকার করে সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে? জাতি এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চায়, এবং সেই উত্তর স্বচ্ছভাবে না পাওয়া পর্যন্ত এই সমালোচনা থামবে না।
লেখক: মাধ্যমিক শিক্ষক ও শিক্ষা গবেষক