বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতার নৈতিকতা ও জ্ঞানতাত্ত্বিক দায়

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতার নৈতিকতা ও জ্ঞানতাত্ত্বিক দায়

প্রতিকী ছবি

বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একজন শিক্ষক খুঁজে পাওয়া যায়, যার ক্লাসে আসন খালি থাকে না এবং হাসির রোল থামে না। শিক্ষার্থীরা তার কক্ষের সামনে ভিড় করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার প্রশংসায় মুখর থাকে, আর সেমিস্টার শেষে প্রায় সবাই সর্বোচ্চ গ্রেড নিয়ে ফেরে। তবু একটি সরল প্রশ্ন প্রকাশ্যে উচ্চারিত হয় না : শিক্ষার্থীরা আসলে কী শিখল?

এখানে যে পার্থক্যের কথা বলতে চাই, তা কঠোর ও বন্ধুসুলভ শিক্ষকের পার্থক্য নয়। শ্রেণিকক্ষে আন্তরিকতা একটি গুণ, আর রসবোধ অনেক সময় এমন দরজা খুলে দেয় যা নিরস বক্তৃতা পারে না। প্রকৃত পার্থক্যটি হলো জনপ্রিয়তার সন্ধানী শিক্ষক আর জ্ঞানের সন্ধানী শিক্ষকের মধ্যে। প্রথমজনের কাছে শিক্ষকতা একটি পেশা, যার বিনিময়ে বেতন মেলে। দ্বিতীয়জনের কাছে তা একটি ব্রত, অর্থাৎ স্বেচ্ছায় গৃহীত এক নৈতিক অঙ্গীকার।

জার্মান সমাজতাত্ত্বিক ম্যাক্স ভেবার ১৯১৭ সালে মিউনিখে প্রদত্ত তার বিখ্যাত বক্তৃতা ‘বৃত্তি হিসাবে বিজ্ঞান’-এ এই সংকটটি চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি সতর্ক করেছিলেন, একজন অধ্যাপক কতজন শিক্ষার্থী আকর্ষণ করেন তা তার পাণ্ডিত্যের মাপকাঠি নয়, কারণ ভিড় প্রায়ই নির্ভর করে মেজাজ, কণ্ঠস্বর কিংবা এমন সব বাহ্যিক বিষয়ের ওপর, যার সঙ্গে জ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি আরও বলেছিলেন, বক্তৃতাকক্ষ বাগাড়ম্বরপ্রিয় জননেতার মঞ্চ নয়।

জনপ্রিয়তাকামী শিক্ষকের কর্মপদ্ধতি লক্ষ্য করা যাক। পাঠ্যসূচি দীর্ঘ, তাই তিনি অর্ধেক পড়িয়ে চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য ‘শর্ট সিলেবাস’ ঘোষণা করেন। শিক্ষার্থীরা উল্লসিত হয়, আর শিক্ষক প্রস্তুতির শ্রম থেকে রেহাই পান। পাঠ ও সমস্যা-বিশ্লেষণের বদলে শ্রেণির সময় গড়িয়ে যায় গল্পগুজব, চলচ্চিত্রের খবর, রাজনৈতিক রসিকতা ও নিজের ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণে। সময়টি আনন্দে কাটে, কিন্তু কারও কাছে কিছুই দাবি করা হয় না। পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি হয় তাড়াহুড়ায়, প্রায়ই পুরোনো প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি, গাইড বই থেকেই যার উত্তর মেলে, আর যার মান বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির প্রত্যাশার চেয়ে অনেক নিচে। এরপর আসে উদার নম্বর প্রদান। উত্তর ভালো বলে নয়, বরং উচ্চ নম্বর দিয়ে শুভেচ্ছা কেনা যায় বলেই গ্রেড স্ফীত হয়।

এই শুভেচ্ছা নিরীহ নয়। তা রূপান্তরিত হয় প্রভাবে : বিভাগীয় বিরোধে, শিক্ষক-নির্বাচনে, পদোন্নতি ও কমিটির রাজনীতিতে সক্রিয় করা যায় এমন এক অনুসারী-গোষ্ঠীতে। এ ধরনের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সামনে সহকর্মীদের হেয় করেন, নবীন প্রভাষক ‘পড়াতে জানেন না’ বলে ইঙ্গিত দেন, এবং অক্লান্তভাবে মনে করিয়ে দেন যে তার নিজের বিদ্যায়তনই দেশের একমাত্র প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয়। যে বিষয়ে তিনি কদাচিৎ কথা বলেন, তা হলো গবেষণা। তার কোর্স শেষ করেও শিক্ষার্থীরা একটি সাহিত্য-পর্যালোচনা লিখতে শেখে না, একটি গবেষণা-প্রশ্ন দাঁড় করাতে পারে না, একটি সাম্প্রতিক জার্নাল প্রবন্ধও পড়ে না। তিনি শিক্ষার্থীদের কর্মবাজারের বাস্তবতা, সেখানে প্রয়োজনীয় দক্ষতা কিংবা তাদের নম্বরপত্র ও প্রকৃত সক্ষমতার ব্যবধান সম্পর্কেও সৎভাবে কিছু বলেন না। যেখানে দিকনির্দেশনা থাকার কথা ছিল, সে শূন্যস্থান পূরণ করে বিনোদন।

তাহলে প্রকৃত শিক্ষক কী করেন? মূলত সেই কাজগুলোই, যা চাকচিক্যহীন। তিনি প্রস্তুতি নেন। তিনি পাঠ্যসূচি সম্পন্ন করেন, আর না পারলে নিজের অবহেলা ঢাকতে পরীক্ষাকে ছেঁটে না ফেলে সততার সঙ্গে তা স্বীকার করেন। তিনি এমন প্রশ্ন করেন যা মুখস্থবিদ্যা নয়, চিন্তা দাবি করে, এবং এমন ন্যায্যতায় মূল্যায়ন করেন যার জন্য শিক্ষার্থী আজ অসন্তুষ্ট হলেও দশ বছর পরে কৃতজ্ঞ থাকে। মার্কিন শিক্ষাচিন্তক পার্কার পামার The Courage to Teach গ্রন্থে এক বাক্যে বিষয়টি ধরেছেন : আমরা যা, আমরা তা-ই শেখাই। বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অলস শিক্ষক কোর্সের শিরোনাম যা-ই হোক, শেষ পর্যন্ত অলসতাই শেখান।

প্রকৃত শিক্ষক একইসঙ্গে গবেষক, কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কোচিং সেন্টার নয়। ভিলহেল্ম ফন হুমবোল্টের আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ধারণা দাঁড়িয়ে ছিল শিক্ষাদান ও গবেষণার ঐক্যের ওপর: অধ্যাপক জ্ঞানের সীমান্ত থেকে পাঠদান করবেন এবং শিক্ষার্থীদের জ্ঞান-নির্মাণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করবেন। পরবর্তীকালে আর্নেস্ট বয়ার পাণ্ডিত্যের ধারণাকে আবিষ্কার, সমন্বয়, প্রয়োগ ও শিক্ষাদান-এই চার মাত্রায় প্রসারিত করেন; কিন্তু কোনো মাত্রাই শিক্ষককে জ্ঞান উৎপাদনের দায় থেকে অব্যাহতি দেয় না। বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকের জ্ঞানতাত্ত্বিক দায় হলো নিজের ছাত্রজীবনে মীমাংসিত ধারণার পুনরাবৃত্তি নয়, বরং সেগুলোকে প্রশ্ন করা, যাচাই করা এবং নতুন জ্ঞান সংযোজন করা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহুল উদ্ধৃত উপমাটি এখানে প্রাসঙ্গিক : প্রদীপ নিজে না জ্বললে অন্য প্রদীপ জ্বালাতে পারে না। চাকরি পাওয়ার দিন থেকে যিনি পড়াশোনা বন্ধ করেছেন, শ্রেণিকক্ষে তার রসিকতা যত উজ্জ্বলই হোক, তিনি এক নিভে যাওয়া প্রদীপ।

আমাদের নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসেও স্পষ্ট দৃষ্টান্ত আছে। বিশ শতকের বিশের দশকে ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজ, যারা ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের পুরোধা, তাদের মুখপত্র শিখা-এর শিরোনামে লিখেছিলেন : ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক প্রায় কিছুই প্রকাশ করেননি, তবু আহমদ ছফার যদ্যপি আমার গুরু সাক্ষ্য দেয়, তার পাঠ ও আলাপচারিতা প্রজন্মের পর প্রজন্ম গবেষককে গড়ে তুলেছে। তার প্রভাবের উৎস ছিল গভীরতা, নম্বর বা দলাদলি নয়। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ‘আলোকিত মানুষ চাই’ আহ্বানকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছেন এক সামগ্রিক আন্দোলন, যা মনে করিয়ে দেয় যে শিক্ষাদানের লক্ষ্য মনন গঠন, ভক্তগোষ্ঠী পরিচালনা নয়।

বেল হুকস শ্রেণিকক্ষকে একাডেমির সবচেয়ে বৈপ্লবিক সম্ভাবনার পরিসর বলে অভিহিত করেছিলেন। তিনি শিক্ষায় আনন্দের বিরোধী ছিলেন না; বরং শ্রেণিকক্ষে উদ্দীপনার পক্ষেই সওয়াল করেছেন। কিন্তু ধারণা নিয়ে উদ্দীপনা আর শিক্ষককে নিয়ে উদ্দীপনা এক নয়। জনপ্রিয়তাকামী শিক্ষক এ পরিসরকে মঞ্চে পরিণত করেন; প্রকৃত শিক্ষক একে পরিণত করেন কর্মশালায়।

তবে এ সংকট শুধু ব্যক্তিচরিত্রের বিষয় নয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায়ই ভুল জিনিসকে পুরস্কৃত করে। পদোন্নতি অনেক সময় মানসম্পন্ন প্রকাশনার চেয়ে চাকরির মেয়াদ ও রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর বেশি নির্ভর করে। মূল্যায়ন-ফরম শিখন নয়, সন্তুষ্টি পরিমাপ করে। টিউশন ফি-নির্ভর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর শিক্ষার্থীদের খুশি রাখা ও গ্রেড উঁচু রাখার নিরন্তর চাপ থাকে। ব্রিটিশ সমালোচক স্টেফান কোলিনি দেখিয়েছেন, বাজারের মানদণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়কে বিচার করলে তার গভীরতম মূল্য, অর্থাৎ মুক্ত জ্ঞানান্বেষণ, দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

সুতরাং সংস্কার হতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত উভয় স্তরে : প্রশ্নপত্রের বহিঃস্থ মডারেশন, গ্রেড-বণ্টনের স্বচ্ছ নিরীক্ষা, পিয়ার-রিভিউড গবেষণার সঙ্গে পদোন্নতির সংযোগ, এবং এমন বিভাগীয় সংস্কৃতি যা কঠোর মূল্যায়নকারী সহকর্মীকে শাস্তি নয়, সুরক্ষা দেয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে মানুষ দিয়েই, আর প্রথম সংস্কারটি প্রতিটি শিক্ষকের একান্ত সিদ্ধান্ত; তিনি কেমন শিক্ষক হতে চান।

জনপ্রিয়তা নিজে কোনো অপরাধ নয়। অনেক প্রকৃত শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের গভীর ভালোবাসা পান। পার্থক্য কেবল অগ্রাধিকারের ক্রমে। প্রকৃত শিক্ষক কঠোর অনুশীলন, যত্ন ও সততার উপজাত হিসাবে ভালোবাসা অর্জন করেন; জনপ্রিয়তাকামী শিক্ষক সেই কঠোরতা ও সততা বিসর্জন দিয়ে ভালোবাসা কেনেন। প্রথমজন রেখে যান চিন্তাশীল শিক্ষার্থী; দ্বিতীয়জন রেখে যান এমন এক সুখানুভূতি, যা প্রথম চাকরির সাক্ষাৎকার পর্যন্ত টেকে।

একজন বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষক কয়েক বছরের জন্য জাতির ভবিষ্যতের মনন নিজের হাতে ধারণ করেন। এটি একটি আমানত, সুবিধা নয়। সময় এসেছে একে আমানত হিসাবেই গ্রহণ করার।

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন : সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ