অভিশাপ দেওয়া মুমিনের স্বভাব নয়
ফাইল ছবি
মানুষের মুখের একটি শব্দ কখনো কখনো তার জীবনের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। রাগের মাথায় উচ্চারিত একটি অভিশাপ, ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে কাউকে লানত করা কিংবা সামান্য বিরোধে অন্যের ধ্বংস কামনা করা—এসবকে কেউ কেউ তেমন গুরুতর বিষয় মনে করেন না।
অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে জিহ্বার অপব্যবহার অত্যন্ত ভয়ংকর অপরাধ। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন কখনো অধিক দোষারোপকারী, অভিশাপকারী, অশ্লীলভাষী ও কটুভাষী হতে পারে না।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৯৭৭)
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুমিনের চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। একজন মুমিন মানুষের ভুলত্রুটি দেখলে সংশোধনের চেষ্টা করবে; কিন্তু তাকে অভিশাপ দিয়ে অপমান করবে না।
কারণ, অভিশাপ দেওয়া কোনো সম্মানিত মুমিনের স্বভাব হতে পারে না। বরং তা গুরুতর গুনাহের কারণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনকে অভিশাপ দেয়, সে যেন তাকে হত্যা করল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০৪৭)
হাদিসটির মাধ্যমে অভিশাপের ভয়াবহতা বোঝানো হয়েছে।
কাউকে অভিশাপ দেওয়া এবং তাকে হত্যা করা এক অর্থে সমান অপরাধ—এমনটি বোঝানো উদ্দেশ্য নয়; বরং একজন মুমিনের সম্মানহানি ও তার প্রতি এই ভয়াবহ অন্যায়ের গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে। সুতরাং রাগের মাথায় কাউকে অভিশাপ দেওয়ার আগে প্রত্যেকেরই নিজের পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করা উচিত। কেননা অভিশাপ দেওয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর দিকগুলোর একটি হলো, যার উদ্দেশে অভিশাপ দেওয়া হয়েছে, সে যদি এর যোগ্য না হয়, তাহলে সেই অভিশাপ অভিশাপদাতার দিকেই ফিরে আসতে পারে। অর্থাৎ, অন্যের অকল্যাণ কামনা করতে গিয়ে মানুষ নিজের জন্যই অকল্যাণ ডেকে আনতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো বান্দা কোনো কিছুকে অভিশাপ দেয়, তখন অভিশাপটি আকাশের দিকে উঠে যায়।
কিন্তু আকাশের দরজাগুলো তার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর তা পৃথিবীর দিকে নেমে আসে। কিন্তু পৃথিবীর দরজাগুলোও তার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর তা ডানে-বাঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কোথাও যাওয়ার পথ না পেলে যার প্রতি অভিশাপ দেওয়া হয়েছে, তার দিকে ফিরে যায়। সে যদি এর যোগ্য হয়, তাহলে তার ওপর পড়ে; অন্যথায় তা অভিশাপদাতার দিকেই ফিরে আসে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯০৫)
এমনকি যে ব্যক্তি অভিশাপ দেওয়াকে অভ্যাসে পরিণত করে, সে নিজের জন্য আখিরাতের কল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারানোর আশঙ্কায় থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অভিশাপকারীরা কিয়ামতের দিন সুপারিশকারী কিংবা সাক্ষী হতে পারবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৯৮)
অনেক সময় বাবা-মা রাগের মাথায় সন্তানকে, স্বামী স্ত্রীকে, স্ত্রী স্বামীকে কিংবা কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি অধীনস্থ ব্যক্তিকে অভিশাপ দিয়ে বসেন। অথচ এ ধরনের আচরণ ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে বদদোয়া কোরো না, তোমাদের সন্তানদের বিরুদ্ধে বদদোয়া কোরো না এবং তোমাদের সম্পদের বিরুদ্ধেও বদদোয়া কোরো না। কারণ, এমনও হতে পারে যে, তোমরা আল্লাহর কাছে যে সময়ে কিছু প্রার্থনা করছ, তা এমন সময়ের সঙ্গে মিলে গেল, যখন তাঁর কাছে যা চাওয়া হয়, তিনি তা কবুল করেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৩০০৯)
তাই আসুন, আমরা কাউকে অভিশাপ দেওয়ার পরিবর্তে তার হেদায়েতের জন্য দোয়া করি। প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমার মানসিকতা গড়ে তুলি। আমাদের মুখ থেকে যেন এমন কোনো শব্দ উচ্চারিত না হয়, যা অন্যের হৃদয়ে কষ্ট সৃষ্টি করে কিংবা আখিরাতে আমাদের জন্য অনুতাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ তাআলা আমাদের জিহ্বাকে সব ধরনের অন্যায় ও অশালীনতা থেকে হেফাজত করুন। আমাদের উত্তম চরিত্রের অধিকারী করুন। আমিন।