সহজ ঋণের বাইরে কোরিয়ার বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি চায় বাংলাদেশ

সহজ ঋণের বাইরে কোরিয়ার বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি চায় বাংলাদেশ

সংগৃহীত

দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু সহজ শর্তের ঋণে আটকে রাখতে চায় না বাংলাদেশ। এর বদলে বিনিয়োগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অবকাঠামো, বিকল্প অর্থায়ন ও বেসরকারি খাতের অংশীদারত্বে জোর দিতে চায় সরকার। সিউল সফরে কোরিয়ার সরকারি কর্মকর্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শীর্ষ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈঠকে এ অবস্থান তুলে ধরেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

মঙ্গলবার ছিল সফরের দ্বিতীয় কর্মদিবস। এদিন অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল কোরিয়ার অর্থ ও অর্থনীতি মন্ত্রণালয়, কোরিয়া এক্সিমব্যাংক (কেএক্সিম), কোরিয়া ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন (কেআইসি) এবং কয়েকটি বড় কোম্পানি ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করে। বুধবার প্রতিনিধিদলের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল বলেছে, উন্নয়নের পরের ধাপে কোরিয়া কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখতে পারে। উন্নয়ন-অর্থায়নের পাশাপাশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিল্প অংশীদারত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজি নিয়েও এগিয়ে আসতে পারে দেশটি।

অগ্রাধিকার প্রকল্পে সিদ্ধান্ত পর্যালোচনায়
কেএক্সিমের প্রধান হোয়াং কি-ইয়োনের সঙ্গে বৈঠকে ২০২৩-২০২৭ মেয়াদের ৩০০ কোটি ডলারের ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ডের (ইডিসিএফ) কাঠামো চুক্তির অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। এ সময় তিনটি অগ্রাধিকার প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়। সেগুলো হলো ঢাকার মেট্রোরেল লাইন-৫ (দক্ষিণ), চাঁদপুরের মতলব উত্তর ও মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার মধ্যে প্রস্তাবিত সেতু এবং রেলওয়ের জন্য ২৬০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ।

কেএক্সিম জানিয়েছে, ইডিসিএফের অগ্রাধিকার এখন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কোরিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রকল্প প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ এসব প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে কোরিয়া এখনো চূড়ান্ত কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

বাংলাদেশ ইডিসিএফের অবশিষ্ট অর্থ ব্যবহারের জন্য একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রস্তাব করেছে। পাশাপাশি এআই, ডিজিটাল রূপান্তর, স্মার্ট অবকাঠামো ও টেকসই সরবরাহ ব্যবস্থার মতো নতুন খাত অগ্রাধিকার তালিকায় রাখার প্রস্তাব দিয়েছে।

২০২৩ সালের ৪ মে কোরিয়ার ইনচনে ইডিসিএফের এই কাঠামো চুক্তি সই হয়। এ চুক্তির আওতায় ঋণের সুদহার শূন্য দশমিক শূন্য ১ থেকে শূন্য দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।

১৫ বছরের রেয়াতকালসহ ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ৪০ বছর। আগের কাঠামো চুক্তিতে ২০২১-২০২৫ মেয়াদে বরাদ্দ ছিল ৭০ কোটি ডলার। অর্থাৎ নতুন চুক্তিতে বরাদ্দ চার গুণের বেশি বেড়েছে।

অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে থাকা মেট্রোরেল লাইন-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ পথের সাড়ে ১৩ কিলোমিটারের বেশি হবে পাতাল অংশ। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা, যা প্রায় ৪৯০ কোটি ডলারের সমান। গত ১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) প্রায় ৩০০ কোটি ডলার দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। কোরিয়ার কাছে চাওয়া হয়েছে ১১০ কোটি ডলার। কয়েক মাস ধরে বারবার অনুরোধের পরও কোরিয়া এই ঋণ নিশ্চিত করেনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কৌশলগত সম্পর্কের আহ্বান
কোরিয়ার অর্থ ও অর্থনীতি মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় উপমন্ত্রী হু চ্যাংয়ের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন আমীর খসরু। তিনি দুই দেশের সম্পর্ককে আরো বিস্তৃত ও কৌশলগত পর্যায়ে নেওয়ার আহ্বান জানান। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নত উৎপাদনশিল্প, জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন তিনি।

এডিবির সহায়তায় নেওয়া ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট (আইজিএনডি) উদ্যোগের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে কোরিয়ার কারিগরি সহায়তাকে স্বাগত জানান অর্থমন্ত্রী। এই উদ্যোগের অর্থায়ন ও বাস্তবায়নে কোরিয়াকে আরো বড় পরিসরে যুক্ত হওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, ঢাকা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে যুক্ত করে একটি প্রবৃদ্ধি করিডর গড়ে তোলা এই উদ্যোগের লক্ষ্য। এতে আগামী পাঁচ বছরে ৫০০ কোটি ডলার পর্যন্ত সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে এডিবি।

কোরিয়া জানিয়েছে, এআই, ডিজিটাল রূপান্তর, বিকল্প অর্থায়ন, ভবিষ্যৎ ইডিসিএফ সহযোগিতা এবং আইজিএনডিতে বৃহত্তর অংশগ্রহণ নিয়ে তারা আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ও সার্বভৌম তহবিল
কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা কেআইসির সঙ্গে বৈঠকে অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামোসহ বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক খাতে প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজি আনার বিষয়ে আলোচনা হয়। একটি সম্ভাব্য বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে ১০০ থেকে ২০০ কোটি ডলারের প্রস্তাবিত ‘বাংলাদেশ সভরেন ফান্ড’ নিয়েও কথা হয়। কোরিয়ার তহবিল ব্যবস্থাপকদের মাধ্যমে কেআইসির শেয়ার বিনিয়োগ ও কোরিয়া এক্সিমব্যাংকের ঋণ একসঙ্গে কাজে লাগানোর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হয়।

বাংলা ভাষার এআই মডেল
দুই দেশের সহযোগিতায় এআই একটি সম্ভাবনাময় নতুন খাত হিসেবে উঠে এসেছে। প্রতিনিধিদল এলজি এআই রিসার্চের সঙ্গে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ভাষার উপযোগী একটি বৃহৎ ভাষা মডেল (এলএলএম) তৈরির বিষয়ে আলোচনা করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উৎপাদনশিল্প ও সরকারি সেবায় এআইয়ের ব্যবহার নিয়েও কথা হয়।

বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এআই ও ডেটা সেন্টার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যের কথা জানায় প্রতিনিধিদল। এআই চিপ নির্মাতা ফুরিওসাএআইয়ের সঙ্গে আলোচনায় দেশের এআই খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে কথা হয়। এআই-যুক্ত অবকাঠামো প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়েছে কেএক্সিম।

ঠিকাদারি থেকে বিনিয়োগে যেতে চায় স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি
স্যামসাং সিঅ্যান্ডটির সঙ্গে বৈঠকে অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নগর উন্নয়ন, পর্যটন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে ছাদে ও বড় আকারে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং কিছু নগর উন্নয়ন প্রকল্পও রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি শুধু নির্মাণ ঠিকাদারি (ইপিসি) থেকে সরে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে যেতে আগ্রহ দেখিয়েছে। অগ্রাধিকার প্রকল্প নিয়ে কারিগরি আলোচনা চালিয়ে যেতে দুই পক্ষ একমত হয়েছে।

চট্টগ্রামে কোরিয়ান রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (কেইপিজেড) পরিচালনাকারী ইয়াংওয়ান করপোরেশন কোরিয়ার বিনিয়োগকারীদের নিয়ে একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। সেখানে হালকা প্রকৌশল ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরে বাংলাদেশ। কোরিয়ার কোম্পানিগুলোকে যৌথ উদ্যোগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের নিজেদের সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়।

আলোচনাগুলোকে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প ও বিনিয়োগ অংশীদারত্বে রূপ দিতে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে দুই পক্ষ একমত হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল। গত ৩১ অক্টোবর সপ্তাহব্যাপী এ সফর শুরু হয়।