আমদানি স্বাভাবিক, তবু এলপিজির বাজারে সংকট কেন

আমদানি স্বাভাবিক, তবু এলপিজির বাজারে সংকট কেন

ফাইল ছবি

দেশে এলপিজির আমদানি স্বাভাবিক থাকলেও বাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দিচ্ছে। কখনো আমদানিতে জটিলতা, কখনো কোম্পানিগুলোর সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া—এমন পরিস্থিতিতে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ গ্রাহকেরা। সংকটের সুযোগে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দিয়েও সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে অনেককে। প্রশ্ন উঠেছে, আমদানি স্বাভাবিক থাকার পরও বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হচ্ছে কেন? এর পেছনে কি আমদানি ও পরিবহন ব্যয়ের চাপ, নাকি মজুত ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা?

এদিকে রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির দামও ক্রমাগত বাড়ছে। একসময় ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে খরচ হতো ৯৭৫ টাকা। সাড়ে পাঁচ বছরের ব্যবধানে সেই সিলিন্ডারের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬০ টাকা। অর্থাৎ দাম বেড়েছে ১ হাজার ৮৫ টাকা বা প্রায় ১১০ শতাংশ। শুধু সরকারি নির্ধারিত দামই নয়, বাস্তবে সিলিন্ডার কিনতে ভোক্তাদের গুনতে হচ্ছে আরও ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি। ফলে একটি সিলিন্ডারের জন্য এখন অনেক গ্রাহককে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ৬৩ দফা এলপিজির মূল্য সমন্বয় হয়েছে। এর মধ্যে ৩২ বার দাম বেড়েছে, কমেছে ২৬ বার এবং অপরিবর্তিত ছিল পাঁচবার। সর্বশেষ ২ নভেম্বর ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে অক্টোবরে দাম বাড়ানো হয়েছিল ২৫২ টাকা। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসে সরকারি নির্ধারিত দাম বেড়েছে ৪৭৫ টাকা।

রান্নার জ্বালানির এই বাড়তি খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজেটে এলপিজি বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংসারের অন্যান্য খরচ কমিয়ে রান্নার জ্বালানির ব্যয় মেটাতে হচ্ছে অনেককে। অথচ বিকল্প হিসেবে পাইপলাইনের গ্যাস পাওয়ার সুযোগও সীমিত। দীর্ঘদিন ধরে নতুন আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় শহরমুখী মানুষের বড় একটি অংশকে বাধ্য হয়ে এলপিজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

এলপিজি সরবরাহের প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি খাতনির্ভর। বিইআরসির লাইসেন্স পাওয়া ৫২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আমদানির অবকাঠামো রয়েছে ২৩টির। তবে নিয়মিত আমদানি করে মাত্র ৮ থেকে ১০টি প্রতিষ্ঠান। ফলে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের আমদানি বা সরবরাহ কমে গেলে বাজারে সংকট তৈরি হয়।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলার জটিলতা, ব্যাংকের ঋণসীমা ও শতভাগ নগদ জামানতের শর্তের কারণে কয়েকটি বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান গ্যাস আমদানি করতে পারেনি। পরে সরকারি উদ্যোগে আমদানি বাড়লে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়।

তবে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে আবারও বাজারে সংকট দেখা দেয়। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) হিসাবে, আগস্টে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। অর্থাৎ দুই মাসে আমদানির পরিমাণ প্রায় সমান থাকলেও ২০ সেপ্টেম্বর থেকে কোম্পানিগুলো ডিলারদের সরবরাহ কমাতে শুরু করে। একপর্যায়ে সরবরাহ ৫০ শতাংশের বেশি কমে যায়। তখন নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দিয়েও সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে গ্রাহকদের।

এ পরিস্থিতিতে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ তুলেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম। তার অভিযোগ, কয়েকটি কোম্পানি মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে এবং এক মাসে ৬০০ কোটি টাকার বেশি বাড়তি আয় করেছে। এ বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, কেউ মজুত করেছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। এ জন্য ১২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কাছে এক মাসের দৈনিক আমদানি ও সরবরাহের তথ্য চাওয়া হয়েছে। তবে যাচাইয়ের ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

এলপিজির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার পাশাপাশি জাহাজভাড়া, প্রিমিয়াম ও ডলারের বিনিময় হারের প্রভাব রয়েছে। সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আরামকোর ঘোষিত মাসিক দর বা সৌদি কন্ট্রাক্ট প্রাইস (সৌদি সিপি) বিবেচনায় নিয়ে বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে।

গত ২৯ অক্টোবর থেকে এলপিজি ব্যবসায়ীদের কমিশন বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করে বিইআরসি। মূলত এলপিজির পুনর্নির্ধারিত মূল্যের সঙ্গে এই কমিশন যুক্ত হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে।

২০২১ সালের এপ্রিলে প্রতি মাসে এলপিজির দাম সমন্বয় প্রক্রিয়া চালুর পর ব্যবসায়ীদের কমিশন বাড়ানোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২৯ অক্টোবর প্রথম গণশুনানি করে কমিশন।

এলপিজির দাম ও সংশ্লিষ্ট চার্জ না বাড়িয়ে নির্ধারিত মূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছিল কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, গোপনে মজুত ও অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায় সংগঠনটি।

২৮ অক্টোবর বিইআরসি চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ক্যাব সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান উল্লেখ করেন, এলপিজির দাম ও চার্জ বাড়ানো হলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়বে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বাড়লেই স্থানীয় পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যয় একই অনুপাতে বাড়ে না। তাই আমদানি মূল্যবৃদ্ধির যুক্তিতে সব পর্যায়ে চার্জ ও কমিশন বাড়ানোর যৌক্তিকতা নেই।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং বিকল্প পথে গ্যাস পরিবহনের কারণে ব্যয় বেড়েছে। বিইআরসির হিসাবে, অক্টোবরে জাহাজভাড়া ও প্রিমিয়াম টনপ্রতি ১৬০ ডলারের পরিবর্তে ২৫০ ডলার নির্ধারণ করায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম বেড়েছিল প্রায় ১৪৩ টাকা। নভেম্বরে কোম্পানি, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর কারণে আরও ১৪১ টাকা যুক্ত হয়েছে।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও কমিশন বৃদ্ধির প্রভাব গ্রাহকদের বহন করতে হচ্ছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যয় প্রতিদিন পরিবর্তিত হলেও দেশে মূল্য সমন্বয় হয় মাসে একবার। এতে আমদানিকারকদের প্রকৃত ব্যয় ও নির্ধারিত মূল্যের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।

কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও উন্নত জীবনযাপনের আশায় প্রতিনিয়ত গ্রাম থেকে শহরে আসছেন মানুষ। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে জনসংখ্যা বাড়লেও আবাসিক গ্যাস সরবরাহের সুযোগ সেই অনুপাতে বাড়েনি। দীর্ঘদিন ধরে নতুন আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় নতুন বাড়ি, ফ্ল্যাট কিংবা ভাড়া বাসায় ওঠা পরিবারগুলোর প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে এলপিজি।

শুধু নতুন বাসিন্দারাই নন, অনেক পুরোনো আবাসিক এলাকাতেও গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ সমস্যার কারণে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে শহরে এলপিজির ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু এই বাড়তি চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

পাইপলাইনের গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এলপিজি ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও এর দাম সাধারণ মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে একদিকে গ্যাস সংযোগের সুযোগ নেই, অন্যদিকে সিলিন্ডারের দামও নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। জ্বালানি ব্যবস্থার এই বাস্তবতায় শহরের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছে।

দেশে প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন। অথচ সংকট মোকাবিলায় সরকারের নিজস্ব মজুত ও আমদানি সক্ষমতা সীমিত। কোম্পানিভিত্তিক সিলিন্ডার ব্যবস্থার কারণে একটি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ বন্ধ হলে অন্য প্রতিষ্ঠানের সিলিন্ডার কেনার ক্ষেত্রেও ভোক্তাদের সমস্যায় পড়তে হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এলপিজির দাম বাড়ার একটি কারণ হলেও দেশের আমদানি ব্যবস্থায় সীমিত প্রতিযোগিতা, সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ, মজুতের অভিযোগ এবং দুর্বল বাজার তদারকিও সংকট দীর্ঘায়িত করছে। কোম্পানিগুলোর দৈনিক আমদানি, মজুত ও সরবরাহের তথ্য প্রকাশ না হওয়ায় প্রকৃত সংকট এবং কৃত্রিম সংকটের পার্থক্য নিরূপণ করাও কঠিন হচ্ছে।

এলপিজি এখন শুধু রান্নার জ্বালানি নয়, সাধারণ পরিবারের মাসিক ব্যয়ের বড় একটি অংশ। পাইপলাইনের গ্যাসের নতুন সংযোগ না থাকায় শহরের মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে সিলিন্ডারের ওপর। অথচ সাড়ে পাঁচ বছরে দাম বেড়েছে প্রায় ১১০ শতাংশ। নির্ধারিত দামের চেয়ে বাড়তি অর্থ দিয়েও সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে অনেককে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা কিংবা আমদানি ব্যয়ের যুক্তি থাকলেও বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নির্ধারিত দামে বিক্রি কার্যকরভাবে তদারকির দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে এলপিজির বাড়তি ব্যয়ের বোঝা সাধারণ ভোক্তাদেরই বহন করতে হবে।

জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, গ্যাস সিলিন্ডারের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা, গরুর মাংস ও পোল্ট্রিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দাম আদায় ঠেকাতে দেশব্যাপী নিয়মিত অভিযান ও তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

অভিযানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হালনাগাদ মূল্যতালিকা প্রদর্শন, ক্রয়-বিক্রয়ের ভাউচার সংরক্ষণ ও প্রদান, ওজন ও পরিমাপে কারচুপি রোধ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য ও ওষুধ বিক্রি বন্ধের বিষয়গুলো দেখা হয়। পাশাপাশি গ্যাস সিলিন্ডারের মজুত, নিরাপত্তাবিধি প্রতিপালন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা হয়। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে মামলা ও জরিমানা করা হচ্ছে।