গ্রেনেড হামলা মামলার আসামিরা খালাস পান যে ৫ কারণে

গ্রেনেড হামলা মামলার আসামিরা খালাস পান যে ৫ কারণে

ফাইল ছবি

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবরসহ সব আসামিকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট।

রোববার (১ ডিসেম্বর) ওই ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলার আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের (মৃত্যুদণ্ডের জন্য হাইকোর্টের অনুমোদন) আপিল মঞ্জুর করে বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সব আসামিকে খালাস দিয়ে রায় দেন।

হাইকোর্ট বলেছেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিরোধী দলীয় নেত্রীর সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ ২৪ জনের মৃত্যু ছিল মর্মান্তিক ঘটনা। কিন্তু মামলার অধিকতর তদন্ত, মুফতি হান্নানের দ্বিতীয় দফার জবানবন্দি, অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের প্রক্রিয়া সবকিছুই ছিল বেআইনি।

এসব কারণে বিচারিক আদালতের রায়ে অসামঞ্জস্যতা, আইনের ব্যতয়, বেআইনি কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পেয়েছেন উচ্চ আদালত। আর সে কারণে সব আসামিরা খালাস পেয়েছেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী মোটাদাগে পাঁচটি কারণে সব আসামি খালাস পেয়েছেন। 

সেগুলো হলো- 

শোনা সাক্ষীর ভিত্তিতে নিম্ন আদালতে রায় দেওয়া হয়। হাইকোর্ট বলেছেন শোনা সাক্ষীর ভিত্তিতে সাজা দেওয়া যায় না‌।

তদন্তের পর মামলার অভিযোগপত্র ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দাখিল করতে হয়, ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সেটা গ্রহণ করে বিচারিক আদালতে পাঠান। এখানে সরাসরি বিচারিক আদালতে পাঠানো হয়েছে। যা সঠিক ছিল না। তাই হাইকোর্ট বলেছেন, যে অভিযোগপত্রের (চার্জশিট) ভিত্তিতে নিম্ন আদালত বিচার করেছিল তা আইনগতভাবে সঠিক ছিল না।

 ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একই মামলায় একজন আসামির দুইবার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়া এবং স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন গ্রহণ না করে ওই স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে বিচার করা হয়েছে। হাইকোর্ট বলেছেন- এই প্রক্রিয়ায় যে বিচার হয়েছে, তা অবৈধ।

আদালতে দাখিল করা দুটি অভিযোগপত্রের মধ্যে মিল-অমিল, সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধের সঙ্গে আসামির সম্পৃক্ততা ছিল না। তাই ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচার প্রক্রিয়াকে অবৈধ বলেছেন হাইকোর্ট।

একজনের স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে অন্যদের সাজা দেওয়া সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। তাই হাইকোর্ট সাজা বাতিল করে সবাইকে খালাস দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় ২৪ জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে ২০০৮ সালে দণ্ডবিধি ও বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা দুটি মামলায় ২২ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। সে সময় মুফতি হান্নান স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেয়। সে অভিযোগপত্রে তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর আসামি ছিলেন না। শুরু হয় বিচারকাজ। রাষ্ট্রপক্ষের ৬১ জন সাক্ষী আদালতে এসে সাক্ষ্য দেন। 

এর মাঝে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মামলার অধিকতর তদন্ত চেয়ে আদালতে আবেদন করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (কোন তদন্ত কর্মকর্তা অধিকতর তদন্তের আবেদন করেননি)। তদন্তের অনুমতি দেন আদালত।

তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয় আব্দুল কাহহার আকন্দকে (যিনি এর আগে আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন)। 

এরপর মুফতি হান্নানকে ফের রিমান্ডে নেওয়া হয়। মুফিত হান্নান আদালতে আবার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। যদিও জবানবন্দি দেওয়ার পরপরই জবানবন্দি প্রত্যাহার চেয়ে আদালতে আবেদন করেন মুফতি হান্নান। বিচারকের সামনে রিমান্ডে নির্যাতনের বর্ননাও করেন তিনি। কিন্তু আদালত তার আবেদন গ্রহণ করেননি।

এরপর মুফতি হান্নানের দ্বিতীয় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির আলোকে তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবরসহ আসামির তালিকায় আরও ২৯ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নতুন করে ফের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

এরপর ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর আলোচিত এ মামলায় বাবরসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড, তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে স্থাপিত ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিনের আদালত আলোচিত এ মামলার ঘোষণা করেছিলেন।

পরবর্তীতে বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান।

এরপর ওই বছরের ২৭ নভেম্বর মামলার বিচারিক আদালতের রায় প্রয়োজনীয় নথিসহ হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় পৌঁছে। পাশাপাশি কারাবন্দি আসামিরা আপিল করেন।

চলতি বছরের গত ৩১ অক্টোবর আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের ওপর শুনানি শুরু হয়। এবং গত ২১ নভেম্বর শুনানি শেষে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রেখেছিলেন হাইকোর্ট।