রাসূল (সা.) যেভাবে ঈদ উদ্‌যাপন করতেন

রাসূল (সা.) যেভাবে ঈদ উদ্‌যাপন করতেন

ছবিঃ সংগৃহীত

তখন দ্বিতীয় হিজরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায়। তিনি দেখলেন, মদিনায় বসবাসকারী ইহুদিরা শরতের পূর্ণিমায় নওরোজ উৎসব এবং বসন্তের পূর্ণিমায় মেহেরজান উৎসব উদযাপন করছে।

তারা উৎসব ঘিরে নানা আয়োজন ও আচার-অনুষ্ঠান করে। আনন্দ-আহ্লাদে মেতে থাকে।

সাহাবিরা এসব অনুষ্ঠানে বেশ আনন্দে নিয়ে যোগ দিতেন। কারও কারও মনে ধরেছে সেসব অনুষ্ঠান।

নবীজি (সা.) সাহাবিদের এ দুটি উৎসব পালন করতে নিষেধ করলেন। তাদের উপহার দিলেন এর চেয়ে উত্তম, আনন্দদায়ক ও কল্যাণমুখী দুটি উৎসব।

তিনি বললেন, মহান আল্লাহ তোমাদের ওই উৎসবের বিনিময়ে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মতো পবিত্র দুটি দিন দান করেছেন। এতে তোমরা পবিত্রতার সঙ্গে উৎসব পালন করো। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১১৩৬)। এক মাস রোজা রাখার পর শাওয়াল মাসের প্রথম দিন পালন করা হয় ঈদুল ফিতর।

রাসুলুল্লাহ (সা.) আমল-ইবাদত ও আনন্দের মধ্য দিয়ে ঈদুল ফিতর উদযাপন করেছেন। সেসময় বর্তমানের মতো নতুন কাপড় কেনার ধুম ছিল না। তবে আনন্দ-আহ্লাদ ছিল। নবীজি (সা.) সবার আনন্দের প্রতি খেয়াল রাখতেন। ছোটদের আনন্দ আয়োজনে উৎসাহিত করতেন। শরিয়ত সমর্থিত সব আয়োজন সমর্থন করতেন। 

সেদিন ছিল ঈদের দিন। আবিসিনিয়ার কিছু লোক লাঠি নিয়ে খেলা করছিল। নবীজি (সা.) আয়েশা (রা.)-কে নিয়ে গেলেন সেখানে। সেদিনের স্মৃতির কথা আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন এভাবে, ‘একবার এক ঈদের দিনে আবিসিনিয়ার কিছু লোক লাঠি নিয়ে খেলা করছে। নবীজি (সা.) আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আয়েশা, তুমি কি লাঠিখেলা দেখতে যেতে চাও? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি তখন আমাকে তার পেছনে দাঁড় করান, আমি আমার গাল তার গালের ওপর রেখে লাঠিখেলা দেখতে লাগলাম। তিনি তাদের উৎসাহ দিয়ে বললেন, হে বনি আরফেদা, লাঠি শক্ত করে ধরো। আমি দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম।

তিনি তখন বলেন, তোমার দেখা হয়েছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বলেন, তাহলে এবার যাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯৫০)

এক ঈদে আয়েশা (রা.)-এর ঘরে দুটি বালিকা (দফ বাজিয়ে) বুআস যুদ্ধের গৌরবগাথা গাইছিল। তিনি এসেই বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন এবং তার মুখ ফিরিয়ে রাখলেন। এমন সময় আবু বকর (রা.) আয়েশা (রা.)-কে ধমক দিয়ে বলেন, আল্লাহর রাসুলের কাছে শয়তানের বাজনা? তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তার দিকে ফিরে বলেন, ওদের ছেড়ে দাও। অন্য বর্ণনায় এসেছে, নবী (সা.) বললেন, হে আবু বকর, ওদেরকে ছাড়। প্রত্যেক সম্প্রদায়েরই ঈদ আছে আর আজ হলো আমাদের ঈদের দিন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৯৩১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের দিন কী করতেন। কেমন কাটত তাঁর ঈদ। এখানে সেসব বিষয় উল্লেখ করা হলো—

এক. রাসুলুল্লাহ (সা.) এ দিন সকালে গোসল করতেন ও সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘নবীজি (সা.) ঈদুল ফিতর ও আজহার দিন গোসল করতেন।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস :১৩১৫) 

দুই. উত্তম পোশাক পরতেন। হাদিস আছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা) প্রতিটি ঈদে ডোরাকাটা পোশাক পরিধান করতেন।’ (সুনানে বায়হাকি, হাদিস: ৬৩৬৩)

তিন. কিছু মিষ্টান্ন মুখে দিয়ে ঈদের নামাজে যেতেন। আনাস (রা.) বলেন, ‘নবীজি (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন সকালে কিছু খেজুর খেতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৫৩)

চার. ঈদগাহে যাওয়ার সময় নিম্ন স্বরে তাকবির পাঠ করতেন। নবীজি (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন তাকবির পাঠ করতে করতে ঈদগাহের দিকে গমন করতেন। নামাজের আগ পর্যন্ত তিনি তাকবির পাঠ অব্যাহত রাখতেন। (সিল সিলাতুল আহাদিস আস-সহিহা, হাদিস: ১৭১)

পাঁচ. যাওয়ার সময় এক রাস্তা দিয়ে যেতেন আর ফেরার সময় অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরতেন। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘নবীজি (সা.) ঈদের দিন ঈদগাহে আসা-যাওয়ার রাস্তা পরিবর্তন করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৮৬)

ছয়. হেঁটে ঈদগাহে যেতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) হেঁটে ঈদগাহে যেতেন এবং হেঁটে ঈদগাহ থেকে ফিরতেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২৯৫)

সাত. দুই রাকাত নামাজ পড়তেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯৮৯)

আট. আত্মীয়স্বজন ও গরিব-দুঃখীদের খোঁজখবর নিতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আখেরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১৩৮)।

নয়. পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানাতেন। জুবাইর বিন নুফাইর (রা.) বলেন,নবীজি (সা.) ও সাহাবিরা ঈদের দিন পরস্পর সাক্ষাৎ হলে বলতেন ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়ামিনকুম অর্থাৎ আল্লাহ আমার ও আপনার যাবতীয় ভালো কাজ কবুল করুক।’ (ফাতহুল কাদির, ২/৫১৭)

দশ. খুতবা দিতেন। আবদুল্লাহ বিন সায়েব (রা.)বলেন, ঈদে নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে আমি উপস্থিত হলাম। এরপর তিনি আমাদের নামাজ পড়িয়েছেন। অতঃপর তিনি বলেন, আমরা নামাজ শেষ করেছি। যার ইচ্ছা সে খুতবা শোনার জন্য বসবে , আর যে চলে যেতে চায়, সে চলে যাবে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস:১২৯৩)

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক