কুরআনের ধারাবাহিক তাফসীর (সূরা আল ইমরান # ৩৬ - ৪০ আয়াত)

কুরআনের ধারাবাহিক তাফসীর (সূরা আল ইমরান # ৩৬ - ৪০ আয়াত)

কুরআনের ধারাবাহিক তাফসীর। নিজস্ব ছবি

তাফসীর হলো আল-কুরআনের আয়াতসমূহের অন্তর্নিহিত শিক্ষা, বিধান ও উদ্দেশ্যের বিশদ ব্যাখ্যা। এর মাধ্যমে মুমিনরা আল্লাহর হেদায়েতের আলোতে জীবনকে সাজাতে সক্ষম হয়। মহান রব আমাদেরকে কুরআন বুঝে সে অনুযায়ী চলার সৌভাগ্য দিন।

*** গত সংখ্যায় প্রকাশিতের পর... 

সূরা আল ইমরান

৩৬ - ৪০ আয়াত

Bismillah

فَلَمَّا وَضَعَتۡهَا قَالَتۡ رَبِّ إِنِّي وَضَعۡتُهَآ أُنثَىٰۖ وَٱللَّهُ أَعۡلَمُ بِمَا وَضَعَتۡۖ وَلَيۡسَ ٱلذَّكَرُ كَٱلۡأُنثَىٰۖ وَإِنِّي سَمَّيۡتُهَا مَرۡيَمَ وَإِنِّيٓ أُعِيذُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتَهَا مِنَ ٱلشَّيۡطَٰنِ ٱلرَّجِيمِ ﴿٣٦﴾

৩৬ ) তারপর যখন সেই শিশু কন্যাটি তার ওখানে জন্ম নিল, সে বললোঃ “হে আমার প্রভু! আমার এখানে তো মেয়ে জন্ম নিয়েছে। অথচ সে যা প্রসব করেছিল তা আল্লাহ‌র জানাই ছিল।-আর পুত্র সন্তান কন্যা সন্তানের মতো হয় না। ৩৪     যা হোক আমি তার নাম রেখে দিলাম মারয়াম। আর আমি তাকে ও তার ভবিষ্যৎ বংশধরদেরকে অভিশপ্ত শয়তানের ফিতনা থেকে রক্ষার জন্য তোমার আশ্রয়ে সোপর্দ করছি।”

فَتَقَبَّلَهَا رَبُّهَا بِقَبُولٍۢ حَسَنٖ وَأَنۢبَتَهَا نَبَاتًا حَسَنٗا وَكَفَّلَهَا زَكَرِيَّاۖ كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيۡهَا زَكَرِيَّا ٱلۡمِحۡرَابَ وَجَدَ عِندَهَا رِزۡقٗاۖ قَالَ يَٰمَرۡيَمُ أَنَّىٰ لَكِ هَٰذَاۖ قَالَتۡ هُوَ مِنۡ عِندِ ٱللَّهِۖ إِنَّ ٱللَّهَ يَرۡزُقُ مَن يَشَآءُ بِغَيۡرِ حِسَابٍ ﴿٣٧﴾

৩৭ ) অবশেষে তার রব কন্যা সন্তানটিকে সন্তুষ্টি সহকারে কবুল করে নিলেন, তাকে খুব ভালো মেয়ে হিসেবে গড়ে তুললেন এবং যাকারিয়াকে বানিয়ে দিলেন তার অভিভাবক। যাকারিয়া ৩৫   যখনই তার কাছে মিহরাবে ৩৬  যেতো, তার কাছে কিছু না কিছু পানাহার সামগ্রী পেতো। জিজ্ঞেস করতোঃ “মারয়াম! এগুলো তোমরা কাছে কোথা থেকে এলো?” সে জবাব দিতোঃ আল্লাহ‌র কাছ থেকে এসেছে। আল্লাহ‌ যাকে চান, বেহিসেব দান করেন।

هُنَالِكَ دَعَا زَكَرِيَّا رَبَّهُۥۖ قَالَ رَبِّ هَبۡ لِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةٗ طَيِّبَةًۖ إِنَّكَ سَمِيعُ ٱلدُّعَآءِ ﴿٣٨﴾

৩৮ ) এ অবস্থা দেখে যাকারিয়া তার রবের কাছে প্রার্থনা করলোঃ “হে আমার রব! তোমরা বিশেষ ক্ষমতা বলে আমাকে সৎ সন্তান দান করো। তুমিই প্রার্থনা শ্রবণকারী।” ৩৭     যখন তিনি মেহরাবে দাঁড়িয়ে নামায পড়ছিলেন

فَنَادَتۡهُ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ وَهُوَ قَآئِمٞ يُصَلِّي فِي ٱلۡمِحۡرَابِ أَنَّ ٱللَّهَ يُبَشِّرُكَ بِيَحۡيَىٰ مُصَدِّقَۢا بِكَلِمَةٖ مِّنَ ٱللَّهِ وَسَيِّدٗا وَحَصُورٗا وَنَبِيّٗا مِّنَ ٱلصَّٰلِحِينَ ﴿٣٩﴾

৩৯ ) তখন এর জবাবে তাকে ফেরেশতাগণ বললোঃ “আল্লাহ্‌ তোমাকে ইয়াহইয়ার ৩৮     সুসংবাদ দান করেছেন। সে আল্লাহ‌র পক্ষ থেকে একটি ফরমানের ৩৯     সত্যতা প্রমাণকারী হিসেবে আসবে। তার মধ্যে নেতৃত্ব ও সততার গুণাবলী থাকবে। সে পরিপূর্ণ সংযমী হবে, নবুওয়াতের অধিকারী হবে এবং সৎকর্মশীলদের মধ্যে গণ্য হবে।”

قَالَ رَبِّ أَنَّىٰ يَكُونُ لِي غُلَٰمٞ وَقَدۡ بَلَغَنِيَ ٱلۡكِبَرُ وَٱمۡرَأَتِي عَاقِرٞۖ قَالَ كَذَٰلِكَ ٱللَّهُ يَفۡعَلُ مَا يَشَآءُ ﴿٤٠﴾

৪০ ) যাকারিয়া বললোঃ “হে আমার রব! আমার সন্তান হবে কেমন করে? আমি তো বুড়ো হয়ে গেছি এবং আমার স্ত্রী তো বন্ধ্যা।” জবাব এলোঃ “এমনটিই হবে। ৪০   আল্লাহ্‌ যা চান তাই করেন।”

"إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوْا وَالَّذِينَ هُم مُّحْسِنُونَ"
— নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাথেই আছেন, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে ও সৎকর্ম করে।
(সূরা নাহল ১৬:১২৮)

*** টিকা নির্দেশিকাঃ

৩৪.

অর্থাৎ মেয়েরা এমন অনেক প্রাকৃতিক দুর্বলতা ও তামাদ্দুনিক বিধি-নিষেধের আওতাধীন থাকে, যেগুলো থেকে ছেলেরা থাকে মুক্ত। কাজেই ছেলে জন্ম নিলে আমি যে উদ্দেশ্যে নিজের সন্তান তোমার পথে উৎসর্গ করতে চেয়েছিলাম, তা ভালোভাবে পূর্ণ হতো।

৩৫.

এখান থেকে সেই সময়ের আলোচনা শুরু হয়েছে যখন হযরত মারয়াম প্রাপ্ত বয়স্কা হলেন, তাঁকে বাইতুল মাকদিসের ইবাদাতগাহে (হাইকেল) পৌঁছিয়ে দেয়া হলো এবং সেখানে তিনি দিন-রাত আল্লাহ‌র যিকিরে মশগুল হয়ে গেলেন। শিক্ষা ও অনুশীলন দানের জন্য তাকে হযরত যাকারিয়ার অভিভাবকত্বে সোপর্দ করা হয়েছিল। আত্মীয়তার সম্পর্কের দিক দিয়ে সম্ভবত হযরত যাকারিয়া ছিলেন তার খালু। তিনি হাইকেলের অন্যতম পুরোহিত ছিলেন। এখানে সেই যাকারিয়া নবীর কথা বলা হয়নি। যাকে হত্যা করার ঘটনা বাইবেলের ওল্‌ড টেস্টামেন্টে উল্লেখিত হয়েছে।

৩৬.

মেহরাব শব্দটি বলার সাথে সাথে লোকদের দৃষ্টি সাধারণত আমাদের দেশে মসজিদে ইমামের দাঁড়াবার জন্য যে জায়গাটি তৈরী করা হয় সেদিকে চলে যায়। কিন্তু এখানে মেহরাব বলতে সে জায়গাটি বুঝানো হয় নি। খৃস্টান ও ইহুদীদের গীর্জা ও উপাসনালয়গুলোতে মূল উপাসনা গৃহের সাথে লাগোয়া ভূমি সমতল থেকে যথেষ্ট উঁচুতে যে কক্ষটি তৈরী করা হয়, যার মধ্যে উপাসনালয়ের খাদেম, পুরোহিত এতেকাফকারীরা অবস্থান করে, তাকে মেহরাব বলা হয়। এই ধরনের একটি কামরায় হযরত মারয়াম এতেকাফ করছিলেন।

৩৭.

হযরত যাকারিয়া (আঃ) সে সময় পর্যন্ত নিঃসন্তান ছিলেন। এই যুবতী পুণ্যবতী মেয়েটিকে দেখে স্বভাবতই তার মনে এ আকাংখা জন্ম নিলঃ আহা, যদি আল্লাহ‌ আমাকেও এমনি একটি সৎসন্তান দান করতেন। আর আল্লাহ‌ তার অসীম কুদরাতের মাধ্যমে যেভাবে এই সংসার ত্যাগী, নিঃসঙ্গ, কক্ষবাসিনী মেয়েটিকে আহার যোগাচ্ছেন। তা দেখে তার মনে আশা জাগে যে, আল্লাহ‌ চাইলে এই বৃদ্ধ বয়সেও তাকে সন্তান দিতে পারেন।

৩৮.

বাইবেলে এর নাম লিখিত হয়েছে, খৃস্ট ধর্মে দীক্ষাদাতা-জোন (John the baptist)। তাঁর অবস্থা জানার জন্য দেখুন, মথিঃ ৩, ১১, ১৪ অধ্যায়; মার্কঃ ১, ৬ অধ্যায় এবং লুকঃ ১, ৩ অধ্যায়।

৩৯.

আল্লাহ্‌র ‘ফরমান’ বলতে এখানে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে বুঝানো হয়েছে। যেহেতু তাঁর জন্ম হয়েছিল মহান আল্লাহ‌র একটি অস্বাভাবিক ফরমানের মাধ্যমে অলৌকিক বিষয় হিসেবে, তাই কুরআন মজীদে তাঁকে “কালেমাতুম মিনাল্লাহু” বা আল্লাহ‌র ফরমান বলা হয়েছে।

৪০.

অর্থাৎ তোমার বার্ধক্য ও তোমার স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব সত্ত্বেও আল্লাহ‌ তোমাকে পুত্র সন্তান দান করবেন।

*** চলমান ***

- সংগৃহিত