আমাদের সমাজে কাজিদের ভুলে গড়ে উঠছে হারাম সংসার

আমাদের সমাজে কাজিদের ভুলে গড়ে উঠছে হারাম সংসার

আমাদের সমাজে কাজিদের ভুলে গড়ে উঠছে হারাম সংসার। ছবিঃ সংগৃহীত

বহু সংসার হারামভাবে চলছে শুধু কাজিদের ভুলের কারণে! কেননা সাধারণ মানুষ তো বিবাহ-তালাকের মাসয়ালা বোঝে না। ফলে কাজিদের ভুল হতে পারে, সে চিন্তাও তারা করে না।অপরদিকে কাজিরা বিবাহ-তালাকের সঠিক নিয়ম ও সূক্ষ্ম পার্থক্য না জানার কারণে এমন ভুল করে বসে, যার দরুন হারাম সংসার গড়ে ওঠে তাই সচরাচর যে ভুলগুলো হয়ে থাকে, তা জানা অত্যন্ত প্রয়োজন।

বিয়ের আগে কাবিননামায় স্বাক্ষররাষ্ট্রীয় আইনে বিয়ের আগে স্বাক্ষর করানোর নিয়ম নেই। বরং বিয়ে পড়ানোর পর কাবিননামায় স্বাক্ষর করাতে হয়। নতুবা স্ত্রী তালাকের অধিকার পায় না, শর্তসমূহ দেওয়ারও কোনো কার্যকারিতা থাকে না। ইসলামি নিয়মে এমন। (বিন্নৌরীটাউন করাচি ফতোয়া নং 144001200389)

ফলে যদি কখনো সমস্যার কারণে স্ত্রী কাজির থেকে তালাকে তাফয়ীজ নেয়, তাতেও তালাক হয় না। ফলে তাদের বিচ্ছেদ না হওয়ায় অন্যত্র বিয়ে বসাটা হারাম হয়। তাই বিয়ে পড়ানোর পর স্বাক্ষর করা।

কোর্টম্যারিজের হলফনামায় স্বাক্ষর করে সংসারকোর্টম্যারিজের হলফনামায় স্বাক্ষর করে কিন্তু মৌখিকভাবে কোনো বিয়ে করে নেয় না বা ইজাব কবুল করে না, এমতাবস্থায় তাদের বিয়ে হয় না। সংসার করা হারাম। (দুরারুল হুককাম ফী শরহি গুরারিল আহকাম ১/৩২৭; আদ্দুররুল মুখতার ৩/১২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৭০) 

কোর্টম্যারিজের হলফনামা নিছক অঙ্গীকারনামা। এটা বিয়ে নয়, এর আইনি কোনো ভ্যালু নাই। আর যদি সাক্ষীদের সামনে মুখে ইজাব কবুল করেও নেয়, তা হলে সংসার বৈধ হবে কিন্তু স্ত্রী এর দ্বারা তালাকের অধিকার পায় না। ফলে পরে তালাক নিলেও তালাক হয় না। এমন অবস্থায় অন্যত্র বিয়ে করলে সেটা হারাম হবে।

স্ত্রীর তালাকের অধিকার আছে কি না তা খেয়াল না করা: স্ত্রী যখন কাজির কাছে তালাক নিতে যায়, তখন অনেক কাজি কাবিননামা আছে কি নাই, নাকি হলফনামাই শুধু আছে; স্বামী বিয়ের আগে নাকি পরে স্বাক্ষর করেছিল, স্ত্রী অধিকার পেয়েছিল কি না, শর্ত থাকলে তা ভঙ্গ হয়েছে কি না, এর ফলে স্ত্রী তালাকের অধিকার পেল কি না—এসবের তোয়াক্কা না করেই কাজি তাফয়ীজের তালাকনামা তৈরি করে দেয়। ফলে স্ত্রীর শরিয়ত মোতাবেক অধিকার না থাকায় এটাতে স্ত্রী স্বাক্ষর করার দ্বারা বা স্বামীর কাছে পাঠানোর দ্বারা তালাক হয় না। ফলে স্ত্রীর অন্যত্র বিয়ে করাও হারাম হয়।

তালাকের অধিকার থাকলেও কাজির ভুল শব্দে তালাকনামা তৈরি করা: স্ত্রীর তালাকের অধিকার যদি থাকেও, কিন্তু কাজি তালাকনামায় এমন সব ভুল কথা লেখে বা লেখা থাকে, যার দ্বারা তালাক হয় না। সেগুলো পয়েন্ট আকারে আলোচনা করা হলো—

(স্ত্রী নিজ নফসের ওপর তালাক নিতে পারে, স্বামীকে তালাক দিতে পারে না। কিন্তু দেখা যায়, তালাকনামায় লেখা থাকে—‘স্বামীকে তালাক দিয়ে বিচ্ছেদ করলাম।’ অথচ স্বামীকে তালাক দেওয়ার দ্বারা তালাক হয় না। (দারুল উলুম দেওবন্দ ফতোয়া নং 25364, বিন্নৌরীটাউন করাচি ফতোয়া নং 143101200218, দারুল ইফতা মিসরিয়্যাহ নং ৪৫৫৩) 

ফলে স্বামী তাফয়ীজ তালাকের কাগজে স্বাক্ষর না করলে বা সম্মতি প্রকাশ না করলে তালাক হবে না। (বাস্তবতা হলো- তাফয়ীজ তালাকনামায় স্বামীর স্বাক্ষরের জায়গাই থাকে না)। ফলে স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে করলে তা হারাম হবে।

() কাবিননামায় তালাকের অধিকারের কোনো সংখ্যা দেওয়া না থাকলে স্ত্রী এক তালাকের অধিকার পায়। (ইখতিয়ার লি তালীলিল মুখতার-৩/১৩৬) অথচ কাজিরা অনেক সময় তালাকনামায় তিন তালাকের কথা লিখে দেয়। ফলে তাফয়ীজ তালাকনামায় এক শব্দে তিন তালাক নেওয়ার কথা বলা থাকে। তাই বিশুদ্ধ মতানুসারে তালাকই হবে না। (ফাতাওয়ায়ে সিরাজিয়া, পৃষ্ঠা ২২১, বাদায়েউস সানায়ে, ৩/১৯৬)

ফলে অন্যত্র বিয়ে বসা হারাম। তবে স্বামী তালাকনামার তিন তালাকের সম্মতি দিয়ে দিলে তালাক হবে।

() অনেক সময় শর্তযুক্ত অধিকার থাকে, অথচ কোনো শর্ত ভঙ্গ না হলেও স্ত্রীকে তাফয়ীজের তালাকনামা তৈরি করে দেওয়া হয়। ফলে তালাক হয় না। সেক্ষেত্রে অন্যত্র বিয়ে করাও হারাম হবে। কেননা শর্তভঙ্গ না হওয়ায় স্ত্রী তালাকের অধিকারই পায়নি। তবে স্বামী সে তালাকের ক্ষেত্রে সম্মতি দিলে তালাক হবে।

(অনেক সময় স্ত্রী একবার তালাক নিয়েছিল, পরে আবার মিলিত হয়েছিল রজয়ী তালাক হওয়ার কারণে, ফেরার সুযোগ ছিল তাই। পরে আবার স্ত্রী তাফয়ীজের তালাকনামা তৈরি করতে যায়। তখন কাজি আবার তাফয়ীজ তালাকনামা তৈরি করে দেওয়াটা ভুল। কেননা কাবিননামার এমন অধিকার যদি দেওয়া থাকে, যার দ্বারা একবারই অধিকার পেয়েছে, তা হলে দ্বিতীয়বার তাফয়ীজ তালাক নেওয়ার দ্বারা তালাক হবে না। ফলে অন্যত্র বিয়ে করলে হারাম হবে। খুব কমসংখ্যক কাবিননামায় তালাকের অধিকার বারবার নেওয়ার পদ্ধতির অধিকার দেওয়া থাকে।

(অনেক সময় রজয়ী তালাকের অধিকার দেওয়া থাকে। ফলে তাফয়ীজ তালাকনামায় বায়েন তালাক নিয়ে থাকে স্ত্রী। ফলে তা রজয়ীই হয়ে থাকে। (ইখতিয়ার লি তালীলিল মুখতার-৩/১৩৮) 

স্বামী ইদ্দতের ভেতরে মুখ ফিরিয়ে নিলেই ফেরানো হয়ে যায়। অথচ স্ত্রীরা মনে করে যে ফেরানো হয়নি। তাই তারা অন্যত্র বিয়ে বসে যায়। ফলে হারাম সংসার তৈরি হয়।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক