ইয়েমেনে ভয়াবহ খাদ্যসংকট: দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা

ইয়েমেনে ভয়াবহ খাদ্যসংকট: দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা

ইয়েমেনে ভয়াবহ খাদ্যসংকট: দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা।। ছবিঃ সংগৃহীত

দীর্ঘ সময় ধরে চলমান যুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার হ্রাসের কারণে ইয়েমেন আবারও ভয়াবহ খাদ্যসংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি) সতর্ক করেছে, ২০২৬ সালের শুরুতে দেশটির অর্ধেকের বেশি মানুষ তীব্র ক্ষুধার মুখে পড়তে পারে। সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ এই সংকটের মধ্যে পড়বেন।

সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানাচ্ছে, এটি ২০২২ সালের পর ইয়েমেনে সবচেয়ে গুরুতর খাদ্যসংকট হবে। ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) অনুযায়ী, আরও অন্তত ১০ লাখ মানুষ প্রাণঘাতী ক্ষুধার ঝুঁকিতে রয়েছেন।

মূল্যায়নে আরও বলা হয়েছে, আগামী দুই মাসের মধ্যে চারটি জেলার কিছু এলাকায় দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে এবং এতে ৪০ হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি ভুক্তভোগী হবে। এটি ২০২২ সালের পর দেশটির জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ পূর্বাভাস।

বছরের পর বছর ধরে চলমান যুদ্ধ ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি মানুষের জীবিকা ধ্বংস করে দিয়েছে এবং মৌলিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত করেছে। এই সংকটের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে দেশব্যাপী অর্থনৈতিক ধস। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে এবং খাদ্যের দাম বেড়েছে। একইসঙ্গে মানবিক সহায়তাও ব্যাপকভাবে কমে এসেছে।

আইআরসি জানায়, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ইয়েমেনের মানবিক সহায়তার প্রয়োজনের মাত্র ২৫ শতাংশেরও কম অর্থায়ন পাওয়া গিয়েছিল, যা এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে জীবনরক্ষাকারী পুষ্টি কর্মসূচিগুলো পেয়েছে প্রয়োজনীয় অর্থের ১০ শতাংশেরও কম।

এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, ‘মানবিক সহায়তায় ভয়াবহ কাটছাঁট, জলবায়ুজনিত ধাক্কা, অর্থনৈতিক ধস এবং সাম্প্রতিক নিরাপত্তা সংকট— সব মিলিয়ে পরিস্থিতির এই দ্রুত অবনতি চলমান বিপর্যয় ঠেকাতে জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজনীয়তাই সামনে এনেছে।’

ইয়েমেনে আইআরসির কান্ট্রি ডিরেক্টর ক্যারোলাইন সেকিয়েওয়া বলেন, যে গতিতে পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে তা উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, ‘পরের বেলা খাবার জুটবে কি না তা নিয়ে ইয়েমেনের মানুষ একসময় শঙ্কায় থাকতো। আমার ভয় হচ্ছে, আমরা হয়তো আবার সেই অন্ধকার অধ্যায়ে ফিরে যাচ্ছি।’

তিনি জানান, পরিবারগুলো চরম কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। তার ভাষায়, ‘ইয়েমেনে খাদ্যসংকট আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, এটি এখন প্রতিদিনের বাস্তবতা। এতে বাবা-মায়েরা অসম্ভব কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কিছু অভিভাবক সন্তানদের খাওয়াতে বন্য উদ্ভিদ সংগ্রহ করতেও বাধ্য হচ্ছেন।’

তবে এত ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি বলেন, এই সংকট এড়ানো সম্ভব। তিনি দাতাদের দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান এবং নগদ সহায়তাকে পরিবারগুলোর মৌলিক চাহিদা মর্যাদার সঙ্গে পূরণের অন্যতম কার্যকর উপায় হিসেবে উল্লেখ করেন।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইয়েমেন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ডিসেম্বরে আমিরাত-সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল দক্ষিণ ও পূর্ব ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয়। তারা সৌদি সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী আবার বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, অমীমাংসিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভূরাজনীতি ও তেলনীতি নিয়ে বিরোধ ইয়েমেনকে আবার বড় ধরনের সংঘাতে ঠেলে দিতে পারে।