ঈদ ঘিরে সক্রিয় জাল নোট কারবারিরা
সংগ্রহীত ছবি
‘ইফতারের কিছু সময় আগে দুই যুবক মোটরসাইকেলে করে ফল কিনতে আসে। তারা দুই হাজার ৫০০ টাকার ফল কিনে নিয়ে যায়। আড়তে টাকা দেওয়ার পর মালিক বলেন, এক হাজার দুইটি নোট জাল। পরে বুঝতে পারি ওই যুবকেরা জাল নোট দিয়ে গেছে।
’
কথাগুলো বলছিলেন ঝিনাইদহ শহরের পায়রা চত্বর এলাকার ফল ব্যবসায়ী কাওসার আলী। গত সোমবার (৯ মার্চ) তার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ঝিনাইদহ ও এর আশপাশের জেলাগুলোতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে জালনোট চক্র। ঈদের আগে বাজারে লেনদেন বাড়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে এসব চক্র জাল টাকা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
এতে ঝুঁকিতে পড়েছে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এসব চক্র অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে জালনোট তৈরি করছে, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে সহজে শনাক্ত করা কঠিন। ইতিমধ্যে তারা এ নিয়ে কাজ শুরু করেছেন।
জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জাল নোটের কারবার এখন ছড়িয়ে পড়েছে ডিজিটাল প্লাটফর্মেও।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে খোলা হয়েছে শতাধিক পেজ। এসব পেজে দেওয়া হচ্ছে নানা অফার। লোভনীয় এসব অফার ক্রেতাদের সামনে হাজির করছে সঙ্ঘবদ্ধ চক্র। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঝিনাইদহ ও এর আশপাশের জেলায় ক্রেতাদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে এসব নকল টাকা।
সূত্র জানায়, একলাখ টাকার জালনোট বিক্রি করা হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায়।
১০০ টাকা থেকে শুরু করে সব ধরনের নোট সরবরাহ করছে চক্রটি। এসব টাকার নোট এতটাই নিখুঁত যে সহজে আসল নকল বোঝার উপায় থাকে না।
সূত্র আরো জানায়, অল্প সময়ে বড়লোক হওয়ার লোভে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এই কারবারে জড়িয়ে পড়েছে। ঈদের আগে পোশাক, খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন খাতে কেনাকাটা বেড়ে যায়। এসব বিষয়কে লক্ষ করে হাটবাজার ও বিপণিবিতানে লেনদেনের সময় জালনোট চালানোর ঘটনা বেশি ঘটছে। বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের তাড়াহুড়োকে কাজে লাগিয়ে ৫০০ ও এক হাজার টাকার জালনোট চালিয়ে দেওয়া হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা।
শহরের কেপি বসু সড়কের কাপড় ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এক ব্যক্তি দোকানে এসে সাত হাজার টাকার মূল্যের দুইটি শাড়ি কেনেন। সবগুলোই নতুন টাকার নোট দেন। পরে ওই ব্যক্তি চলে গেলে জানতে পারি সাত হাজার টাকার মধ্যে চার হাজার টাকা জালনোট দিয়েছে।’
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. লিয়াকত হোসেন বলেন, ‘জাতীয় পর্যায়ে কোনো উৎসব এলেই জালনোটের লেনদেন বেড়ে যায়। এরা মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে। এতে প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঈদের সময় প্রশাসনের নজরদারি আরো কঠোর করতে হবে। সেই সঙ্গে বাজারে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। নইলে এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।’
সোনালী ব্যাংক ঝিনাইদহের উপ-ব্যবস্থাপক বসির উদ্দিন বলেন, ‘আসল টাকার নোট শনাক্ত করার জন্য কয়েকটি নিরাপত্তা বৈশিষ্ট রয়েছে। জলছাপ, নিরাপত্তা সুতা ও রং পরিবর্তনশীল কালি। এসব বৈশিষ্ট যাচাই করলে জালনোট শনাক্ত করা সহজ হয়। তবে ঈদের বেচাকেনার সময় ব্যবসায়ীদের হাতে সময় কম থাকে। এই সময় ক্রেতাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি দক্ষ লোক দিয়ে করতে হবে।’
এ ব্যাপারে ঝিনাইদহ র্যাব ক্যাম্পের অধিনায়ক মেহেদি ইমরান সিদ্দিকি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জালনোট কারবারের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলোকে শনাক্ত করতে ইতিমধ্যে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। আমাদের সাইবার মনিটিরং টিম জালনোটের বিজ্ঞাপনদাতাদের বিষয়ে অনলাইনে কাজ করছে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতারক চক্রের বিষয়ে আমরা তথ্য পেয়েছি।’
মেহেদি ইমরান আরো বলেন, ‘এ ধরনের প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। শিগগির অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে।’