মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিশ্চিহ্নের অপচেষ্টা
প্রতীকী ছবি
১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব গাজীপুর থেকে ফিরছিলেন ঢাকায়। এমন সময় ব্রিগেডিয়ার ও তাঁর সঙ্গীদের জয়দেবপুরের লেভেলক্রসিং এলাকায় বাধা দেয় বীর ছাত্র-জনতা। শুরু হয় বাঙালির প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ। এক পর্যায়ে প্রতিরোধকারীদের অন্যতম কাজী আজিম উদ্দিন আহাম্মদ ব্যক্তিগত বন্দুক থেকে গুলি ছুড়লে পাল্টা গুলি ছোড়ে পাকিস্তানি সেনারাও।
এতে শহীদ হন নিয়ামত, হুরমত ও মনু খলিফা।
মহান মুক্তিযুদ্ধের এই প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের স্মৃতি ধরে রাখতে গাজীপুর শহরের জয়দেবপুর রেললাইনের পশ্চিম পাশে মুক্তমঞ্চে নির্মিত হয়েছিল ‘সশস্ত্র প্রতিরোধ’ ভাস্কর্য। কিন্তু ভাস্কর্যটি উদ্বোধনের আগেই ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন ৫ আগস্ট বিকেলে ভেঙে ফেলা হয়; যা এখনো সংস্কার করা হয়নি।
স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসে যে গাজীপুর প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়েছিল, সেই গাজীপুরেই আজ অবহেলায় ধ্বংসস্তূপ হয়ে পড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভটি।
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রায় এক কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ভাস্কর্যটি নির্মাণ করে। প্রায় ১৩ ফুট উচ্চতার ৯টি ভাস্কর্যের প্রত্যেকটির হাঁটু পর্যন্ত ভেঙে দেওয়া হয়। সামনের দিক থেকে এখন আর ভাস্কর্যের কোনো অবয়ব দৃশ্যমান নয়।
শুধু গাজীপুরের ‘সশস্ত্র প্রতিরোধ’ ভাস্কর্যটিই নয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে দেশের অন্তত ৬০টি জেলায় প্রায় দেড় হাজার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ভাস্কর্য, রিলিফ ভাস্কর্য, টেরাকোটা, ম্যুরাল, স্মৃতিস্তম্ভ ইত্যাদি ভাঙচুর, পুড়িয়ে ফেলা কিংবা উপড়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে।
এসব ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বেশির ভাগ স্মৃতিস্তম্ভই সংস্কার কিংবা পুনর্নির্মাণ করা হয়নি বলে কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর, পুড়িয়ে দেওয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্মিত মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভাঙচুর করা হয়। এখনো অনেক জায়গায় কমপ্লেক্সগুলো ভাঙচুরের ক্ষতচিহ্ন বহন করছে। এসব কমপ্লেক্স গড়ে তোলার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল—এখানে বসে মুক্তিযোদ্ধারা মত বিনিময় করবেন, সময় কাটাবেন এবং ভবনের একটি অংশ ভাড়া দিয়ে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও মেটানো হবে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের ১১৩টি জেলা ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এসব স্থাপনা মেরামতে প্রায় ২০ কোটি ৫০ লাখ টাকা প্রয়োজন বলে হিসাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৩টি কমপ্লেক্স সংস্কারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রায় দেড় কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছিল। বাকি ৯০টির মেরামতে প্রয়োজন প্রায় ১৯ কোটি টাকা। তবে এই পরিমাণ অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই বলা হয়েছে।
জানা গেছে, এ বছরের শুরুতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, এত বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়া সম্ভব নয়। এ অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি উন্নয়ন প্রকল্প তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে, যা অনুমোদন পেলে ধাপে ধাপে এসব কমপ্লেক্স সংস্কার করা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে, মেহেরপুরের মুজিবনগরে মুক্তিযুদ্ধের তিন শতাধিক প্রামাণ্য ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়েছে। এসব ভাস্কর্য ছাড়াও দেশব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর নির্মিত অসংখ্য ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে শিল্পী শ্যামল সরকার নির্মিত বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ প্রতিকৃতি, শিবচরে মুক্তিযুদ্ধ স্মারক ভাস্কর্য, রাজশাহীতে মুক্তিযুদ্ধ স্মারক ভাস্কর্য, বরিশালের উজিরপুর পৌরসভায় শিল্পী শ্যামল সরকার নির্মিত বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়েছে।
এ ছাড়া কেরানীগঞ্জের বাবুবাজারে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য, কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য, ঘাটারচরে শিল্পী সনদ কুমার বিশ্বাস ও রূপম রায় নির্মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর্য, কেরানীগঞ্জের কদমতলী মোড়ের নূর ইসলাম কমান্ডার চত্বরের বীর মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়।
ঢাকার বিজয় স্মরণিতে শিল্পী শ্যামল সরকারের মৃত্যুঞ্জয় ভাস্কর্য, ময়মনসিংহ সংগ্রহশালায় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আবক্ষ প্রতিকৃতি, নরসিংদীতে শিল্পী অলি মাহমুদ, অলোক সরকার, তপন ঘোষ, ইমরান মাহামুদ নির্মিত তর্জনী ও মৃণাল হকের রিকশা ভাস্কর্যও ভাঙচুর করা হয়।
এ ছাড়া রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিল্পী অলোক রায় নির্মিত স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের স্মারক রিলিফ ভাস্কর্য (নির্মীয়মাণ), শিল্পী রূপম রায় ও সৈয়দ তারেক রহমান নির্মিত ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর আত্মসমর্পণের প্রামাণ্য ভাস্কর্য (নির্মীয়মাণ), শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস, শিশির ভট্টাচার্য, শ্যামল চৌধুরী প্রমুখ নির্মিত স্বাধীনতার ইতিহাসভিত্তিক টেরাকোটা রিলিফ ভাস্কর্য এবং শিল্পী রনি পাল, হাবিবুর রহমান ও অলোক রায় নির্মিত ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের প্রামাণ্য ভাস্কর্য (নির্মীয়মাণ) ভাঙচুর করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত অন্যতম স্থান মেহেরপুরের মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র। এখানে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার দেওয়ার দৃশ্যসহ কয়েক শ ভাস্কর্য রয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে ১২ জন আনসার সদস্য সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার দেন। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত তুলে ধরতেই ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে এই ভাস্কর্যসহ তিন শতাধিক ভাস্কর্যের ক্ষতি করা হয়, যা এখন পর্যন্ত সংস্কার হয়নি। সম্প্রতি মেহেরপুরের এই স্মৃতিবিজড়িত এলাকায় গিয়ে দেখা যায় ভাস্কর্যটির বিভিন্ন অংশ এখনো ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায়। সৈয়দ নজরুল ইসলামের ভাস্কর্যের বড় একটি অংশ ভাঙা। তার চারপাশে থাকা আনসার সদস্যদের ভাস্কর্যগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত রয়েছে। এই স্মৃতিকেন্দ্রের বেশির ভাগ স্থাপনাতেই ভাঙচুরের চিহ্ন স্পষ্ট।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, ২০২৪-এর ৫ আগস্ট বিকেলে শতাধিক মানুষ স্মৃতিকেন্দ্রে ঢুকে ভাঙচুর চালায়। তারা একে একে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য, ‘গার্ড অব অনার’ ভাস্কর্য, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্যের ভাস্কর্যসহ মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের বর্ণনাসংবলিত ক্ষুদ্র ভাস্কর্যসহ পুরো কমপ্লেক্সে হামলা করা হয়।
ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি উল্লেখ করে ২০২৫-এর সেপ্টেম্বরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন তৎকালীন মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুস সালাম। সেখানে বলা হয়, বিভিন্ন স্থাপনায় প্রায় ৬১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে এবং সংস্কারের জন্য অর্থ প্রয়োজন। তবে এখনো পর্যন্ত সেই অর্থ বরাদ্দ হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মেহেরপুরের স্মৃতিকেন্দ্র সংস্কারের জন্য মন্ত্রণালয়ের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ নেই। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে বরাদ্দ চাওয়া হলেও তা পাওয়া যায়নি। এখন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে কাজটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার দেড় বছর পার হলেও ভাস্কর্যগুলো প্রতিস্থাপনে জেলা ব্যবস্থাপনা কমিটি চাহিদা পাঠালেও এখনো কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়। এ ঘটনার পর থেকে মুজিবনগরে পর্যটকরা এসে হতাশায় ভুগছেন।
মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সে স্থাপিত আনসার ক্যাম্পের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবেদার রবিউল ইসলাম বলেন, ‘যখন দুর্বৃত্তরা এখানে হামলা শুরু করে, তখন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মুঠোফোনে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছিল। তিনি কোনো নির্দেশনা দিতে পারেননি। এ কারণে আনসার সদস্যরা নিজেদের জীবন ও অস্ত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যারাকে অবস্থান নেন।’
মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ স্বেচ্ছাশ্রমে দীর্ঘদিন ধরে পরিচ্ছন্ন করে আসছেন সুভাস মল্লিক। তিনি বলেন, ‘মুজিবনগরের সৌন্দর্য সব শেষ হয়ে গেছে। আর ভালো লাগছে না। পর্যটকরা এসে আর কী দেখবেন?’
মুজিবনগরে বেড়াতে যাওয়া স্কুল শিক্ষক ইয়ামিন হাসান বলেন, ‘রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু ইতিহাসের ওপর আঘাত করা মোটেও কাম্য নয়। ইতিহাসের টানে বারবার মুজিবনগরে আসি। কিন্তু আগের সেই মুজিবনগর আর পাই না। বর্তমান সরকারের উচিত ইতিহাস রক্ষার প্রয়োজনেই খুব্র দ্রুত সময়ের মধ্যে মুজিবগর স্মৃতি কমপ্লেক্স পুনর্গঠন করা।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন (অব.) আব্দুল মালেক বলেন, ‘মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমেপ্লেক্সের একেকটি ভাস্কর্য স্বাধীনতার প্রতীক। যারা এগুলো ভেঙেছে তারা গর্হিত কাজ করেছে। বর্তমান সরকারের কাছে দাবি করি সুষুম তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য এবং ভেঙে ফেলা ভাস্কর্যগুলো নতুন করে প্রতিস্থাপন করার দাবিও জানাই।’
মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা মুজিবনগর পরিদর্শন করে একটি চাহিদা পাঠাতে বলেছিলেন। এর পরই আমরা ভাস্কর্যগুলো নতুন করে প্রতিস্থাপন, অবকাঠামো ও ইলেকট্রিক কাজগুলো মেরামত করার জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠাই। এখন পর্যন্ত কোনো উত্তর আসেনি।’
মুজিবনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল হুদা বলেন, ‘জেলা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের ভাস্কর্যের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে আমি যোগদান করার আগেই। তবে এখনো মন্ত্রণালয় থেকে কোনো নির্দেশনা আসেনি।’
মুজিবনগর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি।’
রাজধানীর পলাশীর মোড়ের মুক্তিযোদ্ধা ও শিল্পী শামীম শিকদারের ‘স্বাধীনতাসংগ্রাম’ ভাস্কর্যটি ভাঙচুর করা হয়। সেখানে থাকা শতাধিক ভাস্কর্যের মধ্যে বেশির ভাগই ভেঙে ফেলা হয়। সেখানে দেশ-বিদেশের কবি, সাহিত্যিক, বিপ্লবী, রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানীদের ভাস্কর্য উপড়ে ফেলা হয়, যা এখনো সংস্কার হয়নি।
বরিশালের সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি ও পাকিস্তানি বাহিনীর টর্চার সেল কমপ্লেক্সের নানা অবকাঠামো ভাঙচুর করা হয় অভ্যুত্থানের সময়। কিন্তু এর পরে গত দেড় বছরেও কমপ্লেক্সটি সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখনো জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে স্থাপনাটি। ২০২০ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশনের অর্থায়নে দেড় একর জমির ওপর সংরক্ষণ করা হয়েছে নির্যাতন ক্যাম্প, বাংকার, বধ্যভূমি ও সেতু। শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সেতুর ওপর নির্মাণ করা হয় ‘স্মৃতিস্তম্ভ ৭১’।
মুক্তিযোদ্ধা এ এম জি কবীর ভুলু বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সংগ্রাম রাজনৈতিক মতভেদের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত। ভাঙচুরের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বধ্যভূমি ও টর্চার সেল কমপ্লেক্সের স্মৃতিস্তম্ভসহ অন্যান্য অবকাঠামো সংস্কার করে এর মর্যাদা রক্ষায় প্রশাসনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী জানান, বধ্যভূমি ও স্মৃতি কমপ্লেক্সটির সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে তহবিলসংকটের কারণে এখনো কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। অর্থ পেলেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্থাপনাটির সংস্কার করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার চিত্রা নদীর তীরে নির্মিত স্বাধীনতা চত্বর ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভেঙে ফেলা হয়। সেখানে স্থানীয় মানুষ স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে নিয়মিত কর্মসূচি পালন করত। পরে ওই স্থানে অস্থায়ীভাবে কয়েকটি দোকান গড়ে ওঠে। যদিও কয়েক দিনের মধ্যেই সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়। বর্তমানে জায়গাটি ইজি বাইক ও বিভিন্ন সামগ্রী রাখার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ময়মনসিংহের শশী লজে থাকা ভেনাসের ভাস্কর্যটি ভাঙা হয় ২০২৪-এর আগস্টে। তখন শত শত লোক দল বেঁধে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। ময়মনসিংহ শহরে জয়নুল সংগ্রহশালার সামনে থাকা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের মূর্তিটিও ভাঙচুর করা হয়।
মাদারীপুর শহরে নির্মীয়মাণ মুক্তিযুদ্ধের একটি স্মৃতিকেন্দ্রের নাম ছিল ‘পলাশী থেকে ধানমণ্ডি’। শহরের প্রাণকেন্দ্র শকুনির লেকপারে অবস্থিত এই স্মারকের ভেতরের সবকিছু নষ্ট করা হয় তখন।
গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পরিদর্শনকালে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেছেন, স্বাধীনতার এই গৌরবময় ইতিহাস সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। যে জাতি তার ইতিহাস ভুলে যায় সে জাতির অস্তিত্ব টিকে থাকতে পারে না। তাই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও বীরত্বগাথা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে।
এর আগের দিন সোমবার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের পরিচয়, আমাদের ঠিকানা। এই মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই আমরা একটি জাতি পেয়েছি, একটি রাষ্ট্র পেয়েছি। আপনাদের অবিস্মরণীয় এই অবদান আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। আমরা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে বদ্ধপরিকর।’
খুলনায় মুক্তিযোদ্ধা কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুর : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট খুলনায় বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের একাধিক কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। নগরীর সোনাডাঙ্গা মডেল থানার বয়রা পূজাখোলা এলাকায় একটি মুক্তিযোদ্ধা কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়। একই দিনে খালিশপুর থানার বিজিবি অফিসসংলগ্ন একটি কার্যালয়েও হামলার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ফুলতলা উপজেলার একটি এবং কয়রা উপজেলা সদরের আরেকটি মুক্তিযোদ্ধা কার্যালয়েও হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়।
খুলনা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মনিরুজ্জামান মনি এসব ঘটনার তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
[প্রতিবেদনের জন্য তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন কালের কণ্ঠের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা।]