রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি বাড়ছে, চাপে দেশের অর্থনীতি

রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি বাড়ছে, চাপে দেশের অর্থনীতি

ফাইল ছবি

টানা ১৩ বছরের বেশি সময় ধরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব বোর্ডের মোট কর আদায় ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। এটি সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা কম। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই সেই ধারা থেকে এখনো বের হতে পারেনি সংস্থাটি।

ঘাটতির পরিমাণ বেড়েই চলছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায় কম হয়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। তবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। রাজস্ব ঘাটতি বাড়ার চাপ বেড়েছে অর্থনীতিতে।

এনবিআরের গবেষণা ও পরিসংখ্যান অনুবিভাগের তথ্য অনুসারে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি সময়ে আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ও আয়কর এ তিন খাতের মধ্যে কোনো খাতেই লক্ষ্য অর্জন হয়নি। গত জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি সময়ে এনবিআর সব মিলিয়ে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা আদায় করেছে। লক্ষ্য ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। আট মাসে ঘাটতি ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।

এ সময়ে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে। আট মাসে ঘাটতি হয় ৩৩ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। এ খাতে আদায়ের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা। এ সময়ে আদায় হয়েছে ৮৫ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা। কাস্টমস খাতে ১৭ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা ঘাটতি হয়।

এ সময় এ খাতে ৮৯ হাজার ৭৮ কোটি টাকার লক্ষ্যের বিপরীতে আদায় হয়েছে ৭১ হাজার ৯১২ কোটি টাকা। এ সময়ে ভ্যাট বা মূসক আদায় হয়েছে ৯৭ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। এ সময়ে এ খাতের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ২১৪ কোটি টাকা।

রাজস্ব কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধসহ নানা কারণে ব্যবসাবাণিজ্যে ছিল ধীরগতি, যার প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আহরণে। তাদের মতে, এমনিতেই ব্যয়ের চাপ সামলাতে হিমশিম অবস্থায় সরকার। এর মধ্যে এই বিশাল ঘাটতি অর্থবছরের শেষ সময়ে রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে ঋণের দায় পরিশোধ, সরকারের পরিচালন ব্যয় নির্বাহ, বাজেট বাস্তবায়ন করতে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বিকল্প নেই। এমন বাস্তবতায় করজাল বৃদ্ধি করা, কর পরিপালন নিশ্চিতকরণ ও কর ফাঁকি প্রতিরোধ করার পাশাপাশি ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব পুনরুদ্ধারে এনবিআর কাজ করছে বলে জানান কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. মো. আইনুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব অর্জিত না হওয়া একটি নিয়মিত ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে, তবে বর্তমানে এ প্রভাব আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। আগামী বাজেটেও এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে। এনবিআরের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং প্রয়োজনীয় ট্যাক্স সংস্কার সম্পন্ন না হওয়া রাজস্ব ঘাটতির অন্যতম কারণ। রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে অনেক ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন অথবা আইনি জটিলতা ও মামলার কারণে আত্মগোপনে রয়েছেন, যা রাজস্ব আদায়ে প্রভাব ফেলছে।