একই মাটি একই পানি তবু ফলের স্বাদ ভিন্ন, কী অপূর্ব আল্লাহর কুদরত!

একই মাটি একই পানি তবু ফলের স্বাদ ভিন্ন, কী অপূর্ব আল্লাহর কুদরত!

ছবি: সংগৃহীত

আমরা প্রতিদিন ফল খাই, কিন্তু খুব কম মানুষই ভেবে দেখি- একই জমি, একই বৃষ্টি ও একই পানি থেকে জন্ম নেওয়া ফলগুলোর স্বাদ এত ভিন্ন হয় কেন? একটি বাগানের দিকে তাকালে দেখা যায় আম, জাম, লিচু, লেবু নানা জাতের ফলের গাছ। প্রতিটি গাছ একই মাটি থেকে পুষ্টি নিচ্ছে, একই আকাশ থেকে বৃষ্টি পাচ্ছে, একই পানিতে সিক্ত হচ্ছে। অথচ আম মিষ্টি, লেবু টক, জলপাই কষযুক্ত। একই উপকরণ থেকে এই বৈচিত্র্য কীভাবে সম্ভব?

পবিত্র কোরআন আজ থেকে প্রায় ১৪শ বছর আগে মানুষের দৃষ্টি এই বিষয়টির দিকে আকর্ষণ করেছে।

কোরআনের বর্ণনা

পবিত্র কোরআনের সুরা রাদে আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘আর পৃথিবীতে রয়েছে একে অপরের সংলগ্ন বিভিন্ন ভূখণ্ড, আঙুরের বাগান, শস্যক্ষেত এবং খেজুর গাছ, যার কিছু একই মূল থেকে জন্মানো (একাধিক কাণ্ড একই শিকড়ে), আর কিছু পৃথক পৃথক মূল থেকে জন্মানো। এগুলো সবই একই পানি দ্বারা সিঞ্চিত হয়, কিন্তু স্বাদে আমি এগুলোর কতককে কতকের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করি। নিশ্চয়ই এতে বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা রাদ: ৪)

লক্ষণীয়, আয়াতে ‘সিনওয়ান’ ও ‘গাইরে সিনওয়ান’ শব্দ দুটি দিয়ে মূলত খেজুর গাছের শিকড়ের বিন্যাস বোঝানো হয়েছে- একই শিকড় থেকে একাধিক কাণ্ড গজানো বনাম আলাদা আলাদা শিকড় থেকে গজানো। শাখা থাকা বা না থাকার কথা এখানে বলা হয়নি। মুফাসসিরগণ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মূল বার্তাটি তুলে ধরেছেন এভাবে যে, একই মাটি ও একই পানি ব্যবহার করেও ফলের রঙ, স্বাদ ও আকারে যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, তা চিন্তাশীল মানুষের জন্য আল্লাহর কুদরতের একটি নিদর্শন।

বিজ্ঞান ও বিশ্বাস: পরস্পরবিরোধী নয়, বরং দুটি ভিন্ন স্তরের প্রশ্নের জবাব

আধুনিক উদ্ভিদবিজ্ঞান ফলের স্বাদের পার্থক্য ব্যাখ্যা করে উদ্ভিদের জিনগত গঠন, মাটি থেকে শোষিত খনিজের রাসায়নিক রূপান্তর এবং শর্করা-অম্লতার ভারসাম্যের মাধ্যমে। এ ব্যাখ্যা বিজ্ঞানসম্মতভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত।

এখানে একটি বিষয়ে স্পষ্ট থাকা জরুরি- বিবর্তন তত্ত্ব কখনোই এই দাবি করে না যে একই পরিবেশে বেড়ে ওঠা ভিন্ন প্রজাতির মধ্যে গুণাগুণ অভিন্ন হওয়া উচিত; বরং জিনগত বৈচিত্র্য ও প্রজাতিভেদে ভিন্নতা ব্যাখ্যা করাই বিবর্তন তত্ত্বের অন্যতম কাজ। তাই ‘বিজ্ঞান বনাম বিশ্বাস’-এর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে বিষয়টিকে উপস্থাপন না করে বরং এভাবে দেখা ন্যায্য- বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করে প্রক্রিয়াটি কীভাবে ঘটে, আর বিশ্বাসী মন এই সুনিপুণ ব্যবস্থার পেছনে কে আছেন, সেই প্রশ্নে চিন্তা করে।

একজন মুমিনের জন্য এই দুই স্তরের জ্ঞান একে অপরের পরিপূরক। জিনগত প্রক্রিয়াটিও আল্লাহরই সৃষ্টি করা নিয়মের অংশ।

নতুন ফল খাওয়ার সুন্নত আমল

সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, সাহাবিগণ মৌসুমের প্রথম ফল রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে নিয়ে আসতেন। তিনি তা হাতে নিয়ে দোয়া করতেন, যার শুরুর অংশ ছিল- ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি সামারিনা, ওয়া বারিক লানা ফি মাদীনাতিনা...।’ (হে আল্লাহ! আমাদের ফলে বরকত দিন, আমাদের শহর মদিনায় বরকত দিন...)

লক্ষণীয়, এই দোয়াটি মূলত মদিনা শহরের জন্য নির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছিল, ইবরাহিম (আ.)-এর মক্কার জন্য করা দোয়ার অনুরূপ হিসেবে। এরপর রাসুলুল্লাহ (স.) উপস্থিত সবচেয়ে ছোট শিশুর হাতে সেই ফলটি তুলে দিতেন। (সহিহ মুসলিম)

মুমিনের জন্য শিক্ষা

নতুন ফল খাওয়ার সময় এই বিষয়টি স্মরণ করা যায় যে এটি কেবল একটি খাবার নয়, বরং চিন্তা করার একটি উপলক্ষ। আল্লাহ মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ অনুভব করার ক্ষমতা দিয়েছেন বলেই এই বৈচিত্র্য উপভোগ করা সম্ভব হয়। আর প্রকৃতির এই সূক্ষ্ম বিন্যাস দেখে কৃতজ্ঞতা ও বিস্ময়বোধ জাগ্রত হওয়াই কোরআনের আহ্বান- ‘নিশ্চয়ই এতে বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’

একই মাটি ও একই পানি থেকে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের ফল উৎপন্ন হওয়া পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিতে চিন্তাশীল মানুষের জন্য একটি নিদর্শন, যা স্রষ্টার প্রজ্ঞা ও পরিকল্পনার দিকে ইঙ্গিত করে। বিজ্ঞান যেভাবে এর প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে, কোরআন সেভাবেই আমাদের এই সৃষ্টির পেছনের উদ্দেশ্য ও কর্তা নিয়ে ভাবতে আহ্বান জানায়।

প্রতিটি ফলের স্বাদে তাই কেবল তৃপ্তিই নয়, খুঁজে পাওয়া যেতে পারে চিন্তার খোরাকও। একই মাটি ও একই পানি থেকে ভিন্ন স্বাদের ফল সৃষ্টি করার যিনি ক্ষমতা রাখেন, তিনি মানুষের হৃদয়কেও পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখেন। তাই একজন মুমিনের জন্য প্রতিটি ফল স্রষ্টাকে স্মরণ করারও একটি উপলক্ষ।