মহিলাদের মতো পুরুষেরও হতে পারে মুড সুইং
প্রতীকী ছবি।
কখনও হঠাৎ অকারণে বিরক্ত লাগা, কখনও মন খারাপ, আবার কিছুক্ষণ পরই স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া— এমন অভিজ্ঞতা শুধু নারীদেরই নয়, পুরুষদেরও হয়ে থাকে। অনেকেই মনে করেন, হরমোনগত পরিবর্তনের কারণে মুড সুইং কেবল নারীদের সমস্যা। কিন্তু মনোবিজ্ঞান বলছে, পুরুষদের শরীর ও মস্তিষ্কেও এমন নানা পরিবর্তন ঘটে, যা আবেগ ও মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।
মনোবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণা মতে, হরমোনের পরিবর্তন, মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব, শারীরিক ক্লান্তি এবং জীবনযাপনের নানা বিষয় পুরুষদের মুডের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
হরমোনের ওঠানামা
নারীদের মতো পুরুষদের শরীরেও হরমোনের পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ করে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমে গেলে বা ওঠানামা করলে মেজাজে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এতে বিরক্তি, অস্থিরতা, উদ্বেগ, মন খারাপ কিংবা আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়ার মতো অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, হরমোন শুধু শারীরিক শক্তি বা যৌনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এটি মানুষের আবেগ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অতিরিক্ত মানসিক চাপ
কর্মক্ষেত্রের চাপ, আর্থিক দায়িত্ব, পারিবারিক সমস্যা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ পুরুষদের মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে। দীর্ঘদিন ধরে চাপের মধ্যে থাকলে মস্তিষ্কে কর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা মুড সুইংয়ের অন্যতম কারণ।
মনোবিজ্ঞানী ও গবেষক ড্যানিয়েল গোলম্যান বলেন, ‘দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে ছোট ঘটনাতেও বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।’
ঘুমের ঘাটতি
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশ সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে একজন মানুষ সহজেই রেগে যেতে পারেন, বিরক্ত হতে পারেন বা হতাশ বোধ করতে পারেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টানা কয়েক দিন কম ঘুম হলে মুড সুইংয়ের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
আবেগ চেপে রাখার প্রবণতা
অনেক সমাজে এখনও পুরুষদের আবেগ প্রকাশকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। ফলে দুঃখ, ভয়, হতাশা বা উদ্বেগের মতো অনুভূতিগুলো তারা নিজের ভেতরে জমিয়ে রাখেন। দীর্ঘদিন ধরে আবেগ দমন করলে একসময় তা বিরক্তি, রাগ বা আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জন গ্রে মনে করেন, পুরুষদেরও আবেগ প্রকাশের নিরাপদ সুযোগ প্রয়োজন। আবেগ চেপে রাখা মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক ক্লান্তি
দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, অতিরিক্ত চিনি বা প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত ব্যায়ামের অভাবও মুডের ওপর প্রভাব ফেলে। রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত ওঠানামা করলে বিরক্তি, ক্লান্তি ও মনোযোগের সমস্যা দেখা দিতে পারে।এ ছাড়া, অতিরিক্ত কাজের চাপ বা শারীরিক ক্লান্তিও মুড সুইংয়ের কারণ হতে পারে।
কখন সতর্ক হবেন
সাময়িক মুড পরিবর্তন স্বাভাবিক। তবে যদি মুড সুইং দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়, দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করে, সম্পর্কের অবনতি ঘটায় বা হতাশা ও উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন।
মুড ভালো রাখতে যা করবেন
প্রতিদিন ৭–৯ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন। নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করুন। স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবার খান। পরিবারের সদস্য বা বন্ধুর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলুন। অতিরিক্ত মানসিক চাপ কমাতে ধ্যান বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করতে পারেন। প্রয়োজন হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মনোবিজ্ঞানীর সহায়তা নিন।
মুড সুইং শুধু নারীদের বিষয় নয়, এটি মানুষের স্বাভাবিক মানসিক ও শারীরিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ। পুরুষদের ক্ষেত্রেও হরমোন, মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব এবং জীবনযাপনের নানা উপাদান মেজাজের পরিবর্তন ঘটাতে পারে। তাই মুড সুইংকে দুর্বলতা হিসেবে না দেখে শরীর ও মনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। নিজের আবেগকে গুরুত্ব দেয়া এবং প্রয়োজন হলে সাহায্য নেয়াই সুস্থ মানসিক জীবনের অন্যতম চাবিকাঠি।