লটারি প্রথার আড়ালে সরকারি মাধ্যমিক ধ্বংসের চক্রান্ত?

লটারি প্রথার আড়ালে সরকারি মাধ্যমিক ধ্বংসের চক্রান্ত?

ফাইল ছবি

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় তার শ্রেণিকক্ষে। আর সেই শ্রেণিকক্ষের দরজায় যখন মেধার বদলে ভাগ্যের লটারি বসানো হয়, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে—আমরা আসলে কী তৈরি করছি? একটি মেধাবী প্রজন্ম, নাকি একটি বিভ্রান্ত, বিশৃঙ্খল প্রজন্ম? সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়—বিশেষত জেলা শহরগুলোর ঐতিহ্যবাহী স্কুলগুলো—কখনোই শুধু ইটকাঠের প্রতিষ্ঠান ছিল না। এগুলো ছিল দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা এক একটি প্রতিষ্ঠান-সংস্কৃতি, যেখানে কঠোর প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ পরীক্ষায় বাছাই করা শিক্ষকরা, প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় বাছাই করা শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে তুলতেন উৎকর্ষের এক ধারাবাহিক ঐতিহ্য। এই সমীকরণ—মেধাবী শিক্ষক ও মেধাবী শিক্ষার্থী মিলে শ্রেষ্ঠ ফলাফল—কোনো কাকতালীয় বিষয় ছিল না, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত, প্রমাণিত ব্যবস্থা।

কোভিড-১৯ মহামারী একটি জরুরি পরিস্থিতি ছিল, আর জরুরি পরিস্থিতিতে লটারি ছিল একটি সাময়িক সমাধান। কিন্তু জরুরি ব্যবস্থা যখন স্থায়ী নীতিতে রূপ নেয়, তখন সেটি আর ব্যবস্থাপনা থাকে না—তা হয়ে দাঁড়ায় অব্যবস্থাপনার একটি স্থায়ী দলিল। আজ বাস্তবতা হলো: যে শিক্ষার্থী নিজের নামটি পর্যন্ত ঠিকমতো লিখতে পারে না, সে-ও ভাগ্যক্রমে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে এমন এক স্কুলে, যেখানে পাশের বেঞ্চের শিক্ষার্থী হয়তো ইতিমধ্যে গল্পের বই পড়া শুরু করে দিয়েছে। একজন শিক্ষক কি একই সময়ে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মানের শিক্ষার্থীকে ন্যায্যতা দিতে পারেন? উত্তরটা সবার জানা—না। ফলাফল: ধীরে ধীরে স্তিমিত হচ্ছে পাঠদানের মান, শ্লথ হচ্ছে ক্লাসের গতি, আর যে ঐতিহ্য জেলা শহরের সরকারি স্কুলগুলো দশকের পর দশক ধরে বহন করে এসেছে, তা আজ ক্ষয়ে যাচ্ছে চোখের সামনেই।

এখানেই প্রশ্নটা জোরালো হয়ে ওঠে—এই ক্ষয়ে লাভবান হচ্ছে কারা? সরকারি স্কুলের মান যত কমছে, ততই অভিভাবকদের আস্থা সরে যাচ্ছে প্রাইভেট স্কুল ও কোচিং সেন্টারের দিকে—যেখানে ভর্তি হতে হলে এখনো বাছাই পরীক্ষা দিতে হয়, যেখানে এখনো "মেধা যাচাই" শব্দটির অস্তিত্ব আছে। প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ইচ্ছেমতো মেধাবী শিক্ষার্থী বেছে নিচ্ছে, ভালো ফলাফল করছে, আর সেই ফলাফল দেখিয়েই তাদের ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠছে। এটি কি নিছক কাকতালীয়? নাকি সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার এই অবনতি থেকে একটি নির্দিষ্ট মহল পরিকল্পিতভাবে সুবিধা নিচ্ছে—এই প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, যখনই ভর্তি পরীক্ষা ফিরিয়ে আনার কথা ওঠে, তখনই একটি নির্দিষ্ট মহল থেকে সমস্বরে যুক্তি আসে: "শিশুদের ওপর চাপ পড়বে", "কোচিং-নির্ভরতা বাড়বে"। প্রশ্ন হলো—এই মানবিক যুক্তির আড়ালে কি সত্যিই শিশুর কল্যাণচিন্তা কাজ করছে, নাকি একটি সুপরিকল্পিত স্বার্থ? কারণ বাস্তবতা হলো উল্টো—কোচিং করে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি একজন শিশুর মধ্যে প্রতিযোগিতার মানসিকতা তৈরি করে, তার ভিত মজবুত করে। অথচ এই সহজ সত্যটি চাপা দিয়ে, একটি সাজানো বয়ানের মাধ্যমে লটারি প্রথাকে "শিশুবান্ধব" হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে মিডিয়ায়, কলামে, টকশোতে।

এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহর সংসদীয় আহ্বানের প্রেক্ষিতে যখন শিক্ষামন্ত্রী দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষা পুনর্বহালের ঘোষণা দিলেন, তখন দেশের প্রতিটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষাক্ষেত্রের প্রকৃত বাস্তবতা উপলব্ধি করেন এবং শ্রেণিকক্ষের প্রকৃত চিত্র বোঝার সদিচ্ছা রাখেন। একজন শিক্ষক হিসেবে বলতে দ্বিধা নেই—মেধাভিত্তিক ভর্তি পুনর্বহালের এই সাহসী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এক আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছিল। মনে হয়েছিল, অবশেষে এমন একজন নীতিনির্ধারক পাওয়া গেছে, যিনি এসি রুমের সিদ্ধান্ত নয়, বরং ক্লাসরুমের বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে মেধা তার প্রাপ্য জায়গা ফিরিয়ে দিতে চান।

ঠিক এই কারণেই আজকের এই পশ্চাদপসরণ আরও বেশি বিস্ময়কর ও পীড়াদায়ক। শিক্ষামন্ত্রী নিজে যে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন, তার সাথে সামঞ্জস্যহীন একটি প্রস্তাবনা কীভাবে, কার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে তৈরি হচ্ছে—এই প্রশ্ন তোলা তাই আরও জরুরি হয়ে পড়ে। কারণ এখন শোনা যাচ্ছে, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি প্রথা বহাল রাখার একটি প্রস্তাবনা প্রস্তুত হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে—অথচ এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো লিখিত ঘোষণা বা নীতিগত ব্যাখ্যা এখনো জনসমক্ষে আসেনি। মন্ত্রী নিজে যে ইতিবাচক ও মেধাবান্ধব অবস্থান নিয়েছিলেন, তার থেকে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী এই প্রস্তাবনা কি আদৌ তাঁর সম্মতিতে হচ্ছে, নাকি প্রশাসনিক স্তরে কেউ তাঁর সদিচ্ছাকে পাশ কাটিয়ে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে—এই প্রশ্নের স্বচ্ছ জবাব জাতির প্রাপ্য। জনসম্মুখে ঘোষিত একটি ভালো সিদ্ধান্ত থেকে এমন নীরব, ব্যাখ্যাহীন সরে আসা স্বাভাবিকভাবেই জন্ম দেয় নানা প্রশ্নের, আর স্বচ্ছতার এই ঘাটতিই সন্দেহকে আরও জোরালো করে তোলে।

কারণ বাস্তবতা হলো, বেশিরভাগ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় শুরু হয় তৃতীয় শ্রেণি থেকে। একবার এই লটারিতে ভর্তি হয়ে গেলে সেই শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত ওই প্রতিষ্ঠানেই থেকে যাবে। অর্থাৎ ওপর থেকে যতই "ভর্তি পরীক্ষা ফিরছে" বলে প্রচার চালানো হোক না কেন, বাস্তবে লটারি প্রথাই টিকে থাকছে পেছনের দরজা দিয়ে। ঘোষণা এক জায়গায়, বাস্তবায়ন অন্য জায়গায়—এই ফাঁকফোকরটিই আজ সবচেয়ে বেশি জনমনে বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাস তৈরি করছে, এবং এটি শিক্ষামন্ত্রীর নিজের সুনামের জন্যও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, শিক্ষামন্ত্রী যে দূরদর্শিতা নিয়ে মূল সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন, তিনি সেই অবস্থানেই অবিচল থাকবেন এবং প্রশাসনের কোনো অংশ থেকে তাঁর সিদ্ধান্তকে নিষ্ফল করার এই প্রচেষ্টা তিনি স্বয়ং রুখে দেবেন।

যে সরকার শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এগিয়েছে, তাকে বুঝতে হবে—এই ধরনের অস্পষ্ট ও পশ্চাদমুখী সিদ্ধান্ত জনরোষ তৈরির উপযুক্ত উপকরণ। এখানে একটি আশঙ্কার জায়গা তৈরি হয়েছে: প্রশাসনের ভেতরে এমন কিছু অংশ কি সক্রিয় আছে, যারা সরকারকে জনবিচ্ছিন্ন করতে, শিক্ষা খাতে জনঅসন্তোষ উসকে দিতে সচেতনভাবে কাজ করছে? একটি ঘোষিত, ইতিবাচকভাবে গৃহীত সিদ্ধান্তকে এভাবে নীরবে উল্টে দেওয়ার প্রবণতা নিছক প্রশাসনিক জটিলতা বলে মেনে নেওয়া কঠিন। সচেতন অভিভাবক ও শিক্ষকরা ইতিমধ্যে সমালোচনা করছেন। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি একটি সংগঠিত, ন্যায্য দাবির বহিঃপ্রকাশ, যা প্রমাণ করে যে এই উদ্বেগ কোনো বিচ্ছিন্ন মহলের নয়, বরং শিক্ষার মান নিয়ে সত্যিকার অর্থে চিন্তিত একটি বিশাল অংশের। সরকার যদি এখনই এই অস্পষ্ট প্রস্তাবনা প্রত্যাহার না করে এবং স্বচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা পুনর্বহাল না করে, তাহলে এই সমালোচনা কেবল বিস্তৃতই হবে না—তা সরকারের শিক্ষা-সংস্কার ভাবমূর্তির জন্যও একটি বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াবে।

শিক্ষা কোনো লটারির টিকিট নয়। এটি জাতি গঠনের হাতিয়ার। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের অর্জিত সুনাম, তার বাছাই করা মেধাবী শিক্ষকমণ্ডলী এবং তাদের বিশেষায়িত পাঠদান পদ্ধতি—এই পুরো বাস্তুতন্ত্রটি রক্ষা করতে হলে মেধাভিত্তিক ভর্তি প্রক্রিয়া পুনর্বহাল করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে মেধাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষা করবে, নাকি কোনো অস্পষ্ট চাপের কাছে নতিস্বীকার করে সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে? জাতি এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চায়, এবং সেই উত্তর স্বচ্ছভাবে না পাওয়া পর্যন্ত এই সমালোচনা থামবে না।

লেখক: মাধ্যমিক শিক্ষক ও শিক্ষা গবেষক