পরিবর্তনে সদিচ্ছা ও দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হোক

পরিবর্তনে সদিচ্ছা ও দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হোক

ইকরামউজ্জমান

বেশ আগে থেকেই যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বলেছেন, লক্ষ্যহীনভাবে বাংলাদেশ থেকে ২২টি খেলায় ক্রীড়াবিদ, খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের বড় একটি বহর জাপানে অনুষ্ঠিত ২০তম এশিয়ান গেমসে অংশ নেবে। পাশাপাশি এটিও বলেছেন, লক্ষ্যহীনভাবে মহাদেশীয় গেমসে অংশগ্রহণের সুযোগ আগামীতে থাকবে না।

সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করার পর পর্যাপ্ত অনুশীলনের মাধ্যমে প্রস্তুতি নিয়ে পদক জয়ের লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন খেলায় খেলোয়াড় ও ক্রীড়াবিদদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। অংশগ্রহণের জন্য অংশগ্রহণ এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

দেশে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পালাবদল ক্রীড়াঙ্গনে সংস্কারের সুযোগ এনে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নিয়েছে।

এই সরকার নির্বাচনের আগে তাদের দলীয় ইশতেহারে ভোটযুদ্ধে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারলে ক্রীড়াঙ্গনে কী করতে চায় সে বিষয়ে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার জন্য কাজ শুরু করেছে। এটি ইতিবাচক। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে বিগত বছরগুলোতে কখনো কোনো রাজনৈতিক দল ভোটযুদ্ধে জয়ী হওয়ার পর ক্রীড়াঙ্গনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার জন্য এত ত্বরিত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

ক্রীড়াঙ্গনকে গতিশীল করতে হলে প্রথমে অসংগতিগুলো সংশোধনের মাধ্যমে শুরু করা উচিত। বাস্তবসম্মত ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা না থাকলে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে প্রত্যাশিত ফল অর্জন করা সম্ভব নয়। মুখের বয়ানে ক্রীড়াঙ্গনে পরিবর্তন আসে না। সম্ভাবনাময় খেলাগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানসম্মত প্রশিক্ষণ ছাড়া উপায় নেই। পুরনো চিন্তা-ভাবনা থেকে বের হয়ে আসতেই হবে।

বদলাতে হবে ক্রীড়াঙ্গনকে। এর জন্য রাতারাতি পুরো কাঠামো বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। যেটি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো পরিবর্তনের সদিচ্ছা ও দিকনির্দেশনা স্পষ্ট করা।

দেশের ক্রীড়াঙ্গন একটি যুগসন্ধিক্ষণে আছে। দেশ যখন কিছু কিছু মানব উন্নয়ন সূচকে এগিয়ে গেছে, তাহলে ক্রীড়াঙ্গনে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হবে না কেন? ‘কোয়ান্টিটি’ নয় ‘কোয়ালিটি’ দুনিয়াজুড়ে ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান। ক্রীড়াঙ্গনে তো থমকে থাকা নয়, এগিয়ে যাওয়া। আর এই এগিয়ে যাওয়ার জন্য লক্ষ্য স্থির করতে হবে। ক্রীড়াঙ্গনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো তৃণমূলের ক্রীড়াঙ্গন। তৃণমূল পর্যায়ে ক্রীড়াচর্চা শক্তিশালী না হলে পরবর্তী স্তরগুলোতে শক্তিশালী হবে না। অথচ দেশে তৃণমূলের ক্রীড়াঙ্গন সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। এখান থেকে সম্ভাবনা এবং স্বপ্নের জন্ম হয়। তৃণমূলের ক্রীড়াঙ্গনের সমস্যাগুলো দীর্ঘদিনের। এই সমস্যাগুলো যথাযথভাবে চিহ্নিত করে কাজ করতে হবে। খারাপ অতীতকে বারবার টেনে এনে লাভ নেই। সেই সময়টা তো চলে গেছে। এখন নতুন ইতিহাস লেখার সুযোগ। মানুষ দেখতে চাইছে ভাটার ক্রীড়াঙ্গনে জোয়ার। দেখতে চায় না ক্রীড়াঙ্গনে বাস্তবতাবিবর্জিত কার্যক্রম। বর্তমানে প্রতিযোগিতাপূর্ণ ক্রীড়াঙ্গনে টিকে থাকতে হলে বিজ্ঞানভিত্তিক ক্রীড়াঙ্গনের দিকে ঝুঁকতে হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে নিজেদের মেলে ধরা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশ এখন আঞ্চলিক গেমসে সাতের মধ্যে চারের বাইরে আছে। আন্তর্জাতিক গেমসে আশার জায়গায় ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। এটি কী বার্তা বহন করছে? অকার্যকর ক্রীড়াঙ্গন তো কারো কাম্য নয়। অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে গেছে। ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে আত্মজিজ্ঞাসা এবং ভেবে দেখার এখনই সময়। আর কত বছর নিজেরা নিজেদের সঙ্গে ফাঁকির খেলা খেলব।

যখন এই লেখাটি লিখছি, বারবার মনে হচ্ছে ২২ খেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ খেলোয়াড় ও ক্রীড়াবিদদের জন্য এবার ভালো হয়েছে। তাঁরা তাঁদের সামর্থ্য, সীমাবদ্ধতা ও ওজন বুঝতে পেরেছেন। বুঝতে পেরেছেন রূঢ় বাস্তবতা কী জিনিস। চলমান গেমস চোখে আঙুল দিয়ে আরেকবার দেখিয়ে দিল অন্যদের তুলনায় বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদরা কোথায় আছেন।

সেই ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশ এশিয়ান গেমসে প্রতিবার অংশ নিয়েছে। যখন লিখছি ৪৮ বছরে ব্যক্তিগত পদক অর্জন মাত্র দুটি। আর এই দুটি হলো ব্রোঞ্জপদক। প্রথমটি ১৯৮৬ সালে সিউল গেমসে বক্সিংয়ে লাইট হেভিওয়েটে হাবিলদার মোশারফ হোসেন। ৪০ বছর পর চলমান ২০২৬ জাপানের আইচি নাগোয়া গেমসে উশুতে ৫২ কেজি ওজন শ্রেণিতে উঠে ব্রোঞ্জপদক নিশ্চিত করেছেন জিন্নাত আক্তার। জিন্নাত আক্তার প্রথম ম্যাচে ‘বাই’ পেয়েছেন। দ্বিতীয় ম্যাচে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিযোগী অতিরিক্ত ওজনের কারণে ‘ডিসকোয়ালিফায়েড’ হয়েছেন। এতে সেমিফাইনালে উঠে পদক নিশ্চিত হয়েছে। সেমিফাইনালে চীনের প্রতিযোগী উদাইয়ের বিপক্ষে প্রথম রাউন্ডের দুই মিনিটের মধ্যে এক মিনিট ৩৫ সেকেন্ড পর্যন্ত লড়াই করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রতিপক্ষ জিতেছে ৪০ পয়েন্টে। পরের দুই মিনিট আর খেলা হয়নি।

কাবাডি (পুরুষ ও নারী) এবং নারী ক্রিকেটে বলা হচ্ছে আশা ভঙ্গ হয়েছে। আসলে কি তাই! কাবাডি, নারী ক্রিকেটকে তো অনেক খেলার সঙ্গে অতিমূল্যায়ন করে দেখা হয়েছে। যাঁরা অদ্ভুত ‘খোয়াব’ দেখেছেন তাঁরা কেন দেখেছেন এটি তাঁরা ভালোভাবেই জানেন। যখন লিখছি পুরুষ ক্রিকেট শুরু হয়নি। বলা হচ্ছে, একমাত্র লক্ষ্য স্বপ্ন জয়। ভারত ও পাকিস্তান কিন্তু লড়াইয়ে আছে। শেষ পর্যন্ত বাস্তবতায় কী ঘটে সেটি দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া।