যুক্তরাজ্যকে আধুনিক পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন স্টারমার?
সংগ্রহীত ছবি
ব্রিটেনের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উত্তাল ও বিতর্কিত সময় পার করছে। কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে দেশে স্বৈরাচারী ও দমনমূলক শাসনব্যবস্থা কায়েম করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে গাজা উপত্যকায় চলমান ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদরত কর্মীদের ওপর যে ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে, তাকে অনেক বিশ্লেষক আধুনিক পুলিশি রাষ্ট্রের লক্ষণের সঙ্গে তুলনা করছেন।
বর্তমানে যুক্তরাজ্য ১৯৮১ সালের পর ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম এবং তাৎপর্যপূর্ণ এক অনশন কর্মসূচির সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত নভেম্বর থেকে অন্তত আটজন অধিকারকর্মী কারাগারে প্রাক-বিচার আটক অবস্থায় আমরণ অনশন পালন করছেন। তাদের অপরাধ ছিল গাজা গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং ইসরায়েলি অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমসের কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা।
অনশনরত এই কর্মীরা কেবল নিজেদের মুক্তির দাবিই করছেন না, বরং তারা ব্রিটিশ সরকারের ওপর ইসরায়েলি লবিস্টদের প্রভাব এবং ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠনগুলোকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে তকমা দেওয়ারও কঠোর প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
অভিযোগ উঠেছে, রয়্যাল এয়ার ফোর্স বা ব্রিটিশ বিমানবাহিনী গাজায় ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে সরাসরি সহায়তা করছে, যা পরোক্ষভাবে ব্রিটেনকে এই গণহত্যার সহযোগী করে তুলেছে। যদিও সরকারিভাবে দাবি করা হচ্ছে যে এই অভিযানগুলো কেবল জিম্মি উদ্ধারের জন্য পরিচালিত, কিন্তু অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটেনের রয়্যাল এয়ার ফোর্স দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে যে গৌরব অর্জন করেছিল, বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ড সেই ইতিহাসকে কলঙ্কিত করছে বলে মনে করছেন অনেক যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ ও ইতিহাসবিদ।
সাবেক মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে কিয়ারর স্টারমার যখন এই ধরনের গণ-গ্রেফতার এবং কণ্ঠরোধের নেতৃত্ব দেন, তখন তা আরও বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেবলমাত্র ফিলিস্তিন অ্যাকশন সংগঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ করায় প্রায় দুই হাজার সাতশ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এমনকি বয়স্ক এবং শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদেরও প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকার অপরাধে পুলিশি লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে।
এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে সম্প্রতি জাতিসংঘের সাতজন বিশেষজ্ঞ ব্রিটিশ সরকারের প্রতি কড়া বার্তা দিয়েছেন। তারা মানবাধিকার রক্ষার আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইনের অপব্যবহার করে রাজনৈতিক ভিন্নমত দমন করা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। ব্রিটেনের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো যখন সরকারের এই দমনপীড়নের বিষয়ে এক প্রকার নীরবতা পালন করছে, তখন এই অনশনকারী এবং বিক্ষোভকারীরাই রাষ্ট্রের নৈতিক স্খলনের বিরুদ্ধে একমাত্র জীবন্ত প্রতিবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। সরকারের মন্ত্রীরা এই মানবিক সংকটের মুখোমুখি না হয়ে বরং সুকৌশলে এড়িয়ে চলছেন।
ব্রিটেনের বর্তমান এই রাজনৈতিক পরিবেশ কেবল সেই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি সমগ্র পশ্চিম ইউরোপে ছড়িয়ে পড়া কর্তৃত্ববাদী ধারার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। যেখানে ন্যায়বিচারের চেয়ে কৌশলগত স্বার্থ এবং দমনের রাজনীতিই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।