ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে ঘরেই বদলাতে হবে যেসব অভ্যাস

ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে ঘরেই বদলাতে হবে যেসব অভ্যাস

ফাইল ছবি

বর্ষা বিদায় নিচ্ছে, প্রকৃতিতে শরতের আভাসও মিলছে। কিন্তু, বৃষ্টির পর ছাদ, বারান্দা কিংবা ফুলের টবের নিচে জমে থাকা সামান্য পানিই হয়ে উঠতে পারে এডিস মশার জন্য আদর্শ জায়গা। তাই এই মৌসুমে ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে শুধু মশা তাড়ানো নয়, ঘরের কিছু অভ্যাসেও আনতে হবে সামান্য পরিবর্তন।

শরতের আকাশে সাদা মেঘ ভাসলেও হঠাৎ বৃষ্টির দেখা মিলছে। কখনো টানা বৃষ্টি, কখনো কয়েক দিনের বিরতি; এই আবহাওয়ায় বাড়ির বিভিন্ন কোণে জমে থাকা পানি সহজেই চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। অথচ এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য বড় কোনো জলাশয়ের প্রয়োজন নেই; ছোট কোনো পাত্রেও জমে থাকা পানি যথেষ্ট।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পরামর্শও তাই বেশ সহজ; বাড়ির আশপাশে মশার বংশবিস্তারের জায়গা তৈরি হতে না দেওয়া এবং নিয়মিত পানির পাত্র খালি ও পরিষ্কার করা।

সপ্তাহে এক দিন হোক ‘ঘর খোঁজার’ দিন

ঘর পরিষ্কার করার সময় আমরা সাধারণত মেঝে, আসবাব কিংবা জানালার দিকে নজর দিই। কিন্তু, ডেঙ্গুর মৌসুমে পরিষ্কার করার তালিকায় যুক্ত করতে হবে আরও কিছু জায়গা।

বারান্দার ফুলের টব, টবের নিচের পাত্র, ছাদের কোণে পড়ে থাকা বালতি, পানির বোতল, ভাঙা পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার কিংবা এমন যেকোনো জিনিস, যেখানে বৃষ্টির পানি আটকে থাকতে পারে; একবার ঘুরে দেখুন।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি অন্তত সপ্তাহে একবার খালি করা, পাত্র পরিষ্কার করা, উল্টে রাখা বা ফেলে দেওয়ার পরামর্শ দেয়। কারণ মশা পানির কাছাকাছি পাত্রের গায়ে ডিম পাড়তে পারে। তাই সপ্তাহের একটি দিনকে পরিবারের সবাই মিলে ‘মশা খোঁজার দিন’ বানিয়ে ফেলতে পারেন।

ফুলের টব সুন্দর, কিন্তু টবের নিচে পানি নয়

ছাদবাগান কিংবা বারান্দার গাছ এখন শহুরে জীবনের সৌন্দর্যের অংশ। সকাল-বিকেলে গাছের যত্ন নেওয়া যেমন মন ভালো রাখে, তেমনি এ সময় টবের নিচে পানি জমছে কি না, সেটিও খেয়াল করা দরকার।

গাছে পানি দেওয়ার পর অতিরিক্ত পানি যাতে টবের নিচে জমে না থাকে, সেদিকে নজর দিন। বৃষ্টির পরও একইভাবে পরীক্ষা করুন।ছাদবাগানে ড্রাম, বালতি বা পানির পাত্র থাকলে সেগুলো ঢেকে রাখুন। যেসব পাত্রে পানি রাখা প্রয়োজন, সেগুলো নিয়মিত খালি করে পরিষ্কার করার পরামর্শ দিয়েছে ডব্লিউএইচও।

শুধু রাতের মশা নয়

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে একটি ভুল ধারণা হলো; মশা মানেই রাতের মশা। কিন্তু এডিস মশা দিনের বেলাতেও সক্রিয় থাকে। ফলে রাতে মশারি টাঙালেই দিনের ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না।

দুপুরে ঘুমানোর অভ্যাস থাকলে মশারি ব্যবহার করতে পারেন। শিশু ঘুমালে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা দরকার। বাইরে বের হওয়ার সময় শরীরের যতটা সম্ভব অংশ ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করাও সহায়ক হতে পারে।
ডব্লিউএইচও ডিইইটি, পিকারিডিন বা আইআর৩৫৩৫-যুক্ত মশা প্রতিরোধক ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছে।

ঘরের ভেতরেও লুকিয়ে থাকতে পারে মশা

এডিসের সঙ্গে লড়াই মানেই শুধু ছাদ বা ড্রেন পরিষ্কার করা নয়। ঘরের ভেতরেও কিছু জায়গায় মশা আশ্রয় নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, ঘরের অন্ধকার ও আর্দ্র জায়গা যেমন-আসবাবের নিচে, সিঙ্কের আশপাশে, কাপড় রাখার জায়গা বা অন্যান্য কম আলো-বাতাসের স্থানে মশা অবস্থান করতে পারে। জানালা-দরজায় মশা প্রবেশের সুযোগ থাকলে সেগুলোও বন্ধ বা জাল দিয়ে সুরক্ষিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাই ঘর ঝাড়ু দেওয়ার সময় শুধু দৃশ্যমান জায়গা নয়, আসবাবের নিচ ও আড়াল থাকা জায়গাগুলোতেও নজর দিন।

বৃষ্টির পর পাঁচ মিনিটের অভ্যাস

এই মৌসুমে বৃষ্টি থামার পর বাড়ির চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া হতে পারে খুব সহজ একটি অভ্যাস। ছাদে পানি জমেছে কি না, বারান্দার কোনায় পানি আটকে আছে কি না, টবের নিচে পানি আছে কি না, কোনো বোতল বা পাত্র উল্টে আছে কি না; এসব দেখতে খুব বেশি সময় লাগে না।

বিশেষ করে শহরের বাড়িতে নির্মাণসামগ্রী, প্লাস্টিকের পাত্র কিংবা পরিত্যক্ত জিনিসে বৃষ্টির পানি জমে থাকতে পারে। বাংলাদেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধ নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনাতেও প্লাস্টিক বর্জ্য ও দুর্গম শহুরে জায়গায় মশার প্রজননস্থল কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব শুধু নিজের ঘর পর্যন্ত নয়

একটি বাড়ি পরিষ্কার রাখলেই পুরো ঝুঁকি দূর হয় না। বাড়ির সামনের জায়গা, পাশের খালি জায়গা, ছাদ কিংবা আশপাশের পরিত্যক্ত পাত্রেও পানি জমে থাকতে পারে।

২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ডেঙ্গু সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান থাকলেও সেটি সবসময় নিয়মিত প্রতিরোধমূলক আচরণে পরিণত হয় না। গবেষকরা স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের অংশগ্রহণ ও নিয়মিত অভ্যাসকে টেকসই মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু ‘জানি’ বললেই হবে না, সেটিকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।

আবহাওয়ার পরিবর্তনেও বাড়ছে নজরদারির প্রয়োজন

ডেঙ্গুর সঙ্গে আবহাওয়ার সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের নেচার রিভিউজ মাইক্রোবায়োলজিতে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন, চরম আবহাওয়া এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তন মশাবাহিত রোগের বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণে জলবায়ু ও পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ ও জনসম্পৃক্ততা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের মতো উষ্ণ ও বর্ষাপ্রবণ দেশে বিষয়টি আরো প্রাসঙ্গিক। তাই বৃষ্টি হলেই পানি জমতে দেওয়া যাবে না, আবার বৃষ্টি থেমে গেলেও বিষয়টি ভুলে গেলে চলবে না।

জ্বর এলে নিজের মতো ওষুধ নয়

ডেঙ্গু হলে সাধারণত জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও জয়েন্টে ব্যথা, বমি বমি ভাব বা ত্বকে র‍্যাশ দেখা দিতে পারে। তবে, গুরুতর অবস্থার লক্ষণ জ্বর কমে যাওয়ার পরও দেখা দিতে পারে। তীব্র পেট ব্যথা, বারবার বমি, শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত শ্বাস নেওয়া, রক্তপাত কিংবা অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, ডেঙ্গু হলে বিশ্রাম ও পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। জ্বর বা ব্যথার ক্ষেত্রে প্যারাসিটামল ব্যবহারের কথা বলা হলেও আইবুপ্রোফেন ও অ্যাসপিরিনের মতো কিছু ওষুধ এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধের গল্পটা তাই কেবল মশা মারার গল্প নয়। বরং এটি ঘর গোছানোর, বৃষ্টির পর পাঁচ মিনিট সময় দেওয়ার, ফুলের টবের নিচে চোখ রাখার, দিনের বেলায় শিশুকে মশার কামড় থেকে বাঁচানোর এবং নিজের চারপাশের মানুষকেও সচেতন করার গল্প।

শরতের এই বদলে যাওয়া আবহাওয়ায় বড় কোনো উদ্যোগের অপেক্ষা না করে ছোট কিছু অভ্যাস দিয়েই শুরু করা যায়। সপ্তাহে এক দিন বাড়ির চারপাশ খুঁজে দেখা, পানি জমতে না দেওয়া এবং দিনের বেলাতেও মশা থেকে সুরক্ষিত থাকা; এই সামান্য অভ্যাসগুলোই হয়ে উঠতে পারে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রতিরোধের প্রথম ধাপ।