সিজারের পর ইনফেকশন কেন বাড়ছে?
ছবিঃ সংগৃহিত।
সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে দিন দিন বাড়ছে সিজারিয়ান ডেলিভারির প্রবণতা। নরমাল ডেলিভারির তুলনায় সিজারের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে প্রসূতিদের বিভিন্ন জটিলতাও সামনে আসছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো অস্ত্রোপচারের পর ইনফেকশন।
অনেক ক্ষেত্রে সিজারের পর ক্ষতস্থানে সংক্রমণ, জ্বর ও ব্যথাসহ নানা উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। কিন্তু কেন বাড়ছে এই ইনফেকশনের হার? এর পেছনে কী কী কারণ রয়েছে এবং ঝুঁকি কমাতে কী করণীয়, তা জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
মেডিসিন ও সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. মেহেরিন সুলতানা (চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ) জানিয়েছেন, বাংলাদেশে সিজারিয়ান ডেলিভারির সংখ্যা গত দুই দশকে নাটকীয়ভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) ২০২২ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ৪৫% ডেলিভারি সরাসরি সিজারের মাধ্যমে হচ্ছে। ১৯৯৯–২০০০ সালের বিডিএইচএস-এই হার ছিল মাত্র ৩%। অর্থাৎ দুই দশকের কিছু বেশি সময়ে সিজারের হার ৩% থেকে ৪৫%-এই হার উঠেছে। একই সার্ভে অনুযায়ী, প্রাইভেট মেডিকেল সেক্টরে প্রায় ৮৩% এবং পাবলিক সেক্টরে ৩৬% ডেলিভারি সিজারের মাধ্যমে হয়েছে। শহরাঞ্চলে এই হার ৫৬%, গ্রামাঞ্চলে ৪০% এই তথ্য তুলে ধরেন, ডা. মেহেরিন সুলতানা।
তিনি বলেন, ‘এই বিশাল বৃদ্ধির সঙ্গে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যত বেশি সার্জিক্যাল ডেলিভারি হবে, পোস্টঅপারেটিভ কমপ্লিকেশন, বিশেষ করে সার্জিক্যাল-সাইট ইনফেকশন (এসএসআই), প্রতিরোধের দায়িত্বও তত বড় হবে।’
বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র বোঝার জন্য সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি প্রস্পেক্টিভ অবজারভেশনাল স্টাডি-তে দেশের ৬টি টারশিয়ারি হসপিটাল-৩টি সরকারি ও ৩টি বেসরকারি হাসপাতালের ১,৩৩৫ জন সিজার করা প্রসূতিকে ৩০ দিন পর্যন্ত ফলো-আপ করা হয়। সেখানে ১৯.১% রোগীর সার্জিক্যাল-সাইট ইনফেকশন পাওয়া যায়। সরকারি হাসপাতালের রোগীদের মধ্যে এসএসআই ছিল ২১.৬%, আর বেসরকারি হাসপাতালে ১১.৮%। আবার এই গবেষণায় দেখা যায়, ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে ৫৪.৮% রোগীর অন্তত দুটি ইনফেকশন-রিলেটেড সিম্পটম দেখা গিয়েছিল।
কেন এত ইনফেকশন হচ্ছে? জবাবে ডা. মেহেরিন সুলতানা বলেন, ‘এর একটি বড় কারণ হলো, সিজারের রোগীদের সবাই একই ধরনের ক্লিনিক্যাল সিচুয়েশন নিয়ে অপারেশন থিয়েটারে যান না। কেউ প্ল্যানড বা ইলেক্টিভ সিজারিয়ান করেন, আবার কেউ দীর্ঘ সময় লেবার করার পর ইমার্জেন্সি সিজারিয়ানে যান। কেউ অনেক আগে থেকেই ডায়াবেটিস বা অ্যানিমিয়াতে ভুগছেন, কারও অবেসিটি আছে, কারও আবার দীর্ঘ সময় আগে পানি ভেঙে গেছে।’
ডা. মেহেরিন আরও উল্লেখ করেন, ‘অর্থাৎ একটি প্রসূতি যদি দীর্ঘ সময় লেবারে থাকেন, দীর্ঘ সময় মেমব্রেন রাপচার্ড থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ইমার্জেন্সি সিজারিয়ান প্রয়োজন হয়, তাহলে তাঁর ইনফেকশন রিস্ক শুধু “সিজার হয়েছে” এই একটি কারণে তৈরি হচ্ছে না; বরং দীর্ঘ লেবার + প্রলংড রাপচার অব মেমব্রেনস + ইমার্জেন্সি সার্জারি + রোগীর নিজস্ব রিস্ক ফ্যাক্টর-সবগুলো একসঙ্গে কাজ করছে। তবে শুধু রোগীর রিস্ক ফ্যাক্টর দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করলে হাসপাতালের ভূমিকা আড়ালে থেকে যায়।’
তিনি আরও বলেন, তাই বাংলাদেশের বাস্তবতায় সিজারের পর ইনফেকশনের সমস্যা শুধু “অপারেশনের সময় জীবাণু ঢুকে যাওয়া” দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এটি একটি মাল্টিফ্যাক্টোরিয়াল সমস্যা-যেখানে সিজারের ব্যাপক বৃদ্ধি, ইমার্জেন্সি সার্জারি, প্রলংড লেবার, প্রলংড রাপচার অব মেমব্রেনস, ডায়াবেটিস, অবেসিটি, অ্যানিমিয়া, সার্জিক্যাল ফ্যাক্টরস, অ্যান্টিবায়োটিক ইউজ এবং হাসপাতালের ইনফেকশন-প্রিভেনশন ব্যবস্থা-সবগুলো একসঙ্গে ভূমিকা রাখে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি: রিস্ক ফ্যাক্টর থাকা মানেই ইনফেকশন হবে না। রিস্ক ফ্যাক্টর শুধু সম্ভাবনা বাড়ায়। একই রিস্ক ফ্যাক্টর থাকা দুইজন রোগীর আউটকাম এক নাও হতে পারে। তাই সিজারের আগে রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট এবং হাই-রিস্ক রোগীর ক্ষেত্রে বাড়তি মনিটরিং গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান মেডিসিন ও সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. মেহেরিন সুলতানা।