এলএনজি আমদানি ব্যয় : বছরে ছাড়িয়ে যেতে পারে দেড় লাখ কোটি টাকা
সংগৃহীত ছবি
দিনদিন প্রাকৃতিক গ্যাস হ্রাস পাওয়া, শিল্পকারখানাসহ গ্রাহকপর্যায়ে গ্যাসের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারকে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানির পথে হাঁটতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরেই সরকার ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতায় কাতার থেকে বাংলাদেশে এলএনজি আমদানি কমে গেছে। এ অবস্থায় গ্যাসের চাহিদা মেটাতে সরকার স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কার্গো আনছে। শুধু চলতি অর্থবছরেই এলএনজি আমদানিতে সরকারের ব্যয় হতে পারে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যমান এলএনজির মূল্য পরিবর্তন না হলে এর আমদানি ব্যয় আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহল আশঙ্কা করছে।
সরকারও পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে গ্যাসসংকট সামাল দিতে আরও কয়েকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। একটি নতুন টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়ে এরই মধ্যে নীতিগত অনুমোদন পাওয়া গিয়েছে। পরিকল্পনায় থাকা টার্মিনালের মধ্যে যদি কমপক্ষে দুইটি নির্মাণ করা যায় তাহলেই এলএনজি আমদানি ও সরবরাহ সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারদর এবং সরবরাহ সক্ষমতা বিবেচনা করলে দুইটি নতুন টার্মিনাল যুক্ত হলে বছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর বর্তমান স্পট মূল্য অব্যাহত থাকলে তা দেড় লাখ কোটি টাকায়ও পৌঁছাতে পারে।
বর্তমানে মহেশখালীতে দুইটি এফএসআরইউ আছে। যার মোট দৈনিক গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। একই সক্ষমতার আরও দুইটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হলে মোট এলএনজি সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়াবে। কিন্তু এতে সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি এলএনজির আমদানি ব্যয়ের ওপরও চাপ বাড়বে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এখন চাইলেও সরকার এলএনজি আমদানি করতে পারবে না। আমাদের দুইটি এফএসআরইউ দিয়ে সর্বোচ্চ ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আনতে পারি। আরও দুইটি এফএসআরইউ স্থাপনের যে কথা ছিল তা বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার একটি বড় ভুল করেছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন যে কমে যাবে এবং এলএনজি আমদানি করেই ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটাতে হবে, এই চিন্তা থেকেই দুইটি এফএসআরইউ স্থাপনের কথা ভাবা হয়েছিল। এটি বাতিল করার আগে এর বিকল্প কী হতে পারে, তা চিন্তায় রাখা উচিত ছিল।’ তিনি এলএনজি আমদানির ব্যয় কমাতে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে কাজ দেওয়ার ওপর জোর দেন। এতে দ্রুত বাড়তি গ্যাস সরবরাহে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের উৎপাদনও বাড়াতে হবে বলে জানান ম. তামিম।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, গত আটটি অর্থবছরে এলএনজি আমদানি করে গ্যাসের চাহিদা পূরণ করতে সরকারকে ব্যয় করতে হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। আর এই বিপুল পরিমাণ অর্থের জন্য একদিকে যেমন গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে অন্যদিকে ভর্তুকি, বিদেশি ঋণ ও গ্যাস উন্নয়ন তহবিল (জিডিএফ)-এর ওপর পেট্রোবাংলাকে নির্ভর করতে হয়েছে। কিন্তু এত অর্থ ব্যয়ের পরও সম্প্রতি মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনালে সৃষ্ট দুর্ঘটনা, কারিগরি ত্রুটি এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে দেশে গ্যাসসংকটে মারাত্মক বিপর্যয় তৈরি হয়। যার সরাসরি প্রভাব বিদ্যুৎ থেকে শিল্পের উৎপাদন, সিএনজি খাত এবং আবাসিক গ্রাহকদের ওপর পড়ে।
চলতি অর্থবছরে বাজেটে ভর্তুকি হিসেবে এলএনজি খাতে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম দেড় মাসেই ভর্তুকি হিসেবে পেট্রোবাংলা সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। এই অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই এলএনজি আমদানি ও ভর্তুকির বোঝা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
এলএনজি জেকেএম (জাপান-কোরিয়া মার্কেট)-এর তথ্য অনুযায়ী, এখন স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ২২ ডলার ৯৪ সেন্টের কিছু বেশি। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই দাম বেড়েছে প্রায় ৯৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। অথচ বছরের শুরুর দিকে ফেব্রুয়ারিতে এর দাম ছিল ১০ ডলার ৭১ সেন্ট। যা মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে এখন হয়েছে ২২ ডলার ৯৪ সেন্ট। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির তুলনায় মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ১১৪ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণেই এলএনজির আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে দেশে ১১৩টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা হয়েছে। এসব কার্গো আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৫৯ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা। এর সঙ্গে ভর্তুকি হিসেবে আরও ১২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত অর্থবছরের আমদানি পরিমাণ ও ব্যয়কে ভিত্তি ধরলে দুটি নতুন টার্মিনাল নির্মাণের পর এলএনজি আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। তবে কার্গোর সংখ্যা, আন্তর্জাতিক বাজারদর এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সরবরাহ, এসব বিষয়ের ওপর প্রকৃত ব্যয় নির্ভর করবে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, ‘দেশে গ্যাসের চাহিদা ও জোগানের পার্থক্য ক্রমেই বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি এলএনজি আমদানির অবকাঠামো বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৩০টি কূপের খনন ও ওয়ার্কওভার শেষ হয়েছে। আরও কূপ খনন করে দেশীয় গ্যাস সরবরাহে যুক্ত করা গেলে এলএনজি আমদানির ওপর চাপ এবং আমদানি ব্যয় কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।’
শিল্প ঝুঁকিতে, বন্ধ হচ্ছে কারখানা : দেশজুড়ে চলা গ্যাসসংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় তীব্র লোডশেডিং হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে শিল্পকারখানায় উৎপাদনেও। গ্যাসনির্ভর শিল্প এখন অনেকটাই ঝুঁকিতে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমাদের পার্টিকেল বোর্ড মিলটি বন্ধ করে দেব। আগামী দুই বছরেও গ্যাস-বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না, এমন ঘোষণা পাওয়ার পরই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের পাঁচটি স্পিনিং মিল ছিল, এরই মধ্যে পাঁচটিই এখন বন্ধ। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোও আমরা এখন কনসোলিডেট করব। এতে অন্তত যে কর্মীদের এখন কাজ নেই তাঁদের বেতন দিতে হবে না এবং ব্যাংকের দায়ও বাড়বে না। দেশের মোট অর্থনীতির আকার প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলার। এই অর্থনীতিকে শুধু ধরে রাখলেই হবে না, এর প্রবৃদ্ধিও নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে অর্থনীতি ক্রমশ নিম্নমুখী হচ্ছে।’
সংকট নিরসনে সরকারের সর্বোচ্চ চেষ্টা : প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান গতকাল সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করেন। সেখানে তিনি বলেন, জনগণের চলমান জ্বালানিসংকটের প্রতি সরকার সমব্যথী। তবে এটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সংকট। জ্বালানিসংকট নিরসনে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। এ সময় গ্যাসের সরবরাহ পূর্ণমাত্রায় এখনো স্বাভাবিক হয়নি জানিয়ে ডা. জাহেদ বলেন, গ্যাসের কার্গো সরবরাহে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে, তবে তা দ্রুত ঠিক হয়ে যাবে। জ্বালানি খাতে ভালো অবস্থায় যেতে সরকারের প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে। তথ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘জ্বালানিতে যথেষ্ট ভালো অবস্থায় যেতে দুই বছরের মতো সময় লাগবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাকি সময়ে দেশের অবস্থা আগের সময়ের চেয়ে খারাপ থাকবে। আগের চেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকব না। জ্বালানিসংকট থেকে দ্রুত বের হতে পারলে দেশে নতুন নতুন বিনিয়োগ আসবে এবং বন্ধ কারখানাগুলো চালু হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, মোটাদাগে ব্যবস্থাপনায় কিছুটা অদক্ষতা থাকতে পারে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতিই বড় সমস্যা। অন্তর্বর্তী সরকারের দুই বছরে স্থলভাগে গ্যাস খোঁজার চেষ্টা হয়নি। সৌভাগ্যজনকভাবে ওই সময়ে তাদের মধ্যপ্রাচ্য সংকটে পড়তে হয়নি।