বন্ধ ফ্লাইওভার ঘিরে অপরাধের অভয়ারণ্য

বন্ধ ফ্লাইওভার ঘিরে অপরাধের অভয়ারণ্য

সংগ্রহীত ছবি

সম্প্রতি স্থগিত হওয়া ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি (বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট) প্রকল্পের টঙ্গী ফ্লাইওভার এখন অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এক যুগ ধরে নির্মাণকাজ চলা এই ফ্লাইওভারের ওপর-নিচ এখন অপরাধীদের নিরাপদ স্থান, বিশেষ করে সন্ধ্যা নামার পর থেকে সকাল পর্যন্ত এই ফ্লাইওভার সাধারণ মানুষের জন্য মারণফাঁদে পরিণত হয়েছে। এরই মধ্যে এই ফ্লাইওভারে ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত হয়েছে একাধিক পথচারী। সর্বস্ব হারিয়ে আহত হয়েছে অনেক মানুষ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, টঙ্গী ফ্লাইওভারের নিচে রাতের বেলায় কোনো আলো থাকে না। ফ্লাইওভারের ওপরে স্টপেজে যাত্রী নামলেই আতঙ্কে পড়ে যায়। ফ্লাইওভারের ওপরে ছিনতাইকারীদের আক্রমণে একাধিক যাত্রীর নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।  চলতি বছরের ৯ জুলাই রাত ১২টার পর আবদুল্লাপুর ফ্লাইওভার থেকে টঙ্গীর সেনা কল্যাণ ভবনগামী সংযোগ সড়ক দিয়ে নামার সময় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে মাহফুজুর রহমান (২১) নামের এক কলেজছাত্র নিহত হন।

গত ২০ অক্টোবর রাতে টঙ্গীর হোসেন মার্কেট এলাকায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে জাহিদুল আহসান জিহাদ (২১) নামের এক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন।

বিশেষ করে ফ্লাইওভার থেকে স্টেশন রোডে নিচে নামার ব্যবস্থা থাকায় নিম্নমুখী সিঁড়ি এখন আতঙ্কের নাম। রাতের বেলায় দেখা যায়, ফ্লাইওভারের নিচে অসমাপ্ত স্থাপনায় বসে মাদকের হাট। অনেক জায়গায় ভাসমান পতিতাও দেখা যায়।

টঙ্গী পূর্ব থানার ওসি মো. ওয়াহিদুজ্জামান জানান, কয়েক মাসে পাঁচ শতাধিক ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে অল্প সময় পর জামিনে বের হয়ে এরা আবার ছিনতাই ও মাদকে জড়িয়ে যায়।

২০১২ সালে ২০.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ঢাকা থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ শুরু হলেও টঙ্গীর চেরাগ আলী পর্যন্ত এসে আর এগোয়নি। প্রকল্পটির অপরিকল্পিত নির্মাণযজ্ঞের কারণে একাধিক দুর্ঘটনায় মারা গেছে বহু মানুষ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি প্রকল্পে প্রথমে ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ৪০ কোটি টাকা। পরে ব্যয় ধরা হয় চার হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। অর্থায়ন করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি) ও গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ)।

জানা যায়, এই প্রকল্প ১২ বছরেও শতভাগ বাস্তবায়িত হয়নি। প্রকল্প আপাতত অসমাপ্তই থাকছে। ঢাকার বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিশেষ বাস চলাচলের জন্য নির্মাণ করা বিশেষ এই করিডর হয়ে যাচ্ছে সাধারণ যানবাহন চলাচলের চার লেনের সড়ক। অথচ বহু অর্থ ব্যয়ে এই প্রকল্পে সড়ক, উড়াল সড়ক, স্টেশনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। বিআরটি প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়নে অতিরিক্ত আরো তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর এবং মেয়াদ আরো চার বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিলেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে এই প্রস্তাবও ফেরত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। বর্তমান সরকার বিআরটি করিডরে বিশেষ ইলেকট্রিক বাস চলাচলের ধারণা বাতিল করে প্রকল্পের আওতায় নির্মিত চার লেনের সড়কটি সাধারণ যানবাহনের জন্য খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে।

সম্প্রতি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার সড়ক পরিবহন, সেতু ও রেলওয়ে বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. শেখ মইনউদ্দিন বলেছেন, ‘গাজীপুর-বিমানবন্দর বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি প্রকল্প আর হচ্ছে না। এটি সাধারণ চার লেনের সড়ক হিসেবে চালু করা হবে।’