ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়ের নববী রীতি
প্রতীকী ছবি
ঈদ মুসলিম উম্মাহর জন্য আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য উৎসব। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর যখন ঈদের চাঁদ দেখা যায়, তখন মুমিনের অন্তর ভরে ওঠে প্রশান্তি ও কৃতজ্ঞতায়। এই আনন্দকে পরিপূর্ণতা দেয় পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই শুভেচ্ছা বিনিময়ের প্রকৃত পদ্ধতি কী? এ বিষয়ে আমাদের পথপ্রদর্শক হলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবিগণ।
ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের ক্ষেত্রে যে দোয়াটি সাহাবায়ে কিরাম থেকে প্রমাণিত, তা হলো—
تَقَبَّلَ اللَّهُ مِنَّا وَمِنْكُمْ
উচ্চারণ: তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিন্কুম
অর্থ: আল্লাহ আমাদের এবং তোমাদের (ইবাদতসমূহ) কবুল করুন।
ইমাম বায়হাকী (রহ.) ‘আস-সুনানুল কুবরা’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, সাহাবায়ে কিরাম ঈদের দিনে একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে এই দোয়া বলতেন। (বায়হাকী, হাদিস: ৬০৩৩) হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, এই আমলটির সনদ হাসান এবং সাহাবীদের মধ্যে এটি সুপরিচিত ছিল।
এই দোয়ার মাঝে ঈদের প্রকৃত চেতনা নিহিত রয়েছে।
এখানে কেবল আনন্দ প্রকাশ নয়; বরং আল্লাহর কাছে ইবাদত কবুল হওয়ার প্রার্থনাই মুখ্য। কারণ, একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে বড় সফলতা হলো; তার আমল আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হওয়া। রমজানের রোজা, তারাবিহ, দান-সদকা; এসবের গ্রহণযোগ্যতাই ঈদের প্রকৃত আনন্দ।
নববী শিক্ষার সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে অন্তরের অবস্থা ও আখিরাতমুখী চিন্তাকে প্রাধান্য দেয়।
তাই ‘ঈদ মোবারক’ বলা বৈধ হলেও, সাহাবীদের এই দোয়া অনুসরণ করা অধিকতর অর্থবহ ও সওয়াবের কাজ।
ঈদের দিন শুভেচ্ছা বিনিময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তরিকতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও সম্পর্ক সুদৃঢ় করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। ঈদের দিন সেই সম্পর্ক পুনর্গঠনের এক বড় সুযোগ। যারা দূরে সরে গেছে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক জোড়া লাগানো, মনোমালিন্য দূর করা; এসবই ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তোলে।
বর্তমান সময়ে শুভেচ্ছা বিনিময় অনেকাংশেই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তা পাঠানো বা কেবল ‘ঈদ মোবারক’ বলার মধ্যেই সীমিত। অথচ নববী শিক্ষা আমাদের শিখায়, একটি দোয়া হতে পারে অনেক গভীর, অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কেবল শব্দ নয়; বরং একটি হৃদয়ের আবেদন, যা নিজের জন্য যেমন কল্যাণ চায়, তেমনি অন্যের জন্যও কামনা করে।
অতএব, ঈদের আনন্দকে সত্যিকার অর্থে অর্থবহ করতে চাইলে আমাদের উচিত সাহাবীদের এই সুন্নাহকে জীবিত করা। যখন আমরা বলি, “তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিন্কুম” তখন আমরা একে অপরের জন্য আল্লাহর দরবারে কবুলিয়তের দোয়া করি। এর চেয়ে সুন্দর শুভেচ্ছা আর কী হতে পারে?
ঈদ হোক কেবল আনন্দের নয়, বরং দোয়া, ভালোবাসা ও কবুলিয়তের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ একটি দিন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
saifpas352@gmail.com